মুসলিম বাঙালির ভাষাপ্রেম

43 Views

তরীকুর রহমান: প্রভুর অগণিত নিয়ামত রাজিতে ভাষা এক বিশেষ নিয়ামত। যা মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি স্থাপনের পাশাপাশি সামাজিকতা সৃষ্টি ও তার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মাতৃভাষা সর্বাধিক প্রিয়। এ ভাষাতেই মানুষ তার চেতনাকে লালন করে, আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনায় হৃদয়ের ভাব প্রকাশ করে। সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রেম, অনুরাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের অভিব্যক্তি এ ভাষাতেই জানায়। তাই তো মানবতার ধর্ম ইসলাম মাতৃভাষার সঙ্গে দ্বীনের সম্পর্ক জুড়ে দিয়ে এর মর্যাদা দিয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে আসা সব নবী-রাসূলকে পাঠানো হয়েছে স্বজাতির ভাষাভাষী করে। তারা তাদের জাতিকে মাতৃভাষার মাধ্যমে সত্য সুন্দরের প্রতি আহ্বান করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষী করে প্রেরণ করেছি, যেন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। (সূরা ইব্রাহীম- আয়াত ৪)।

আল্লামা সুয়তী তার ইতকান ফি উলুমিল কোরআন গ্রন্থে লেখেন- হজরত মূসা (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ তাওরাত ছিল হিব্রু ভাষায়। দাউদ (আ.) সম্প্রদায় ছিল গ্রিক ইউনানী ভাষী, তাই জাবুর অবতীর্ণ হয়েছিল গ্রিক ইউনানী ভাষায়। সুরিয়ানী ভাষী ঈশা (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ ঐশীগ্রন্থ ইঞ্জিল নাজিল হয়েছিল স্বজাতির ভাষা সুরিয়ানীতে। তেমনি মুহাম্মদ (সা.)-এর ভাষা আরবি বলেই কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে আরবি ভাষায়। (আল্ ইতকান- খণ্ড-১ পৃ. ৮৭)। এ প্রসঙ্গে হাদিসে রাসূলে ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহ তায়ালা কোনো নবী-রাসূলকে তার স্বজাতির ভাষা ছাড়া পাঠাননি। (আহমদ হাদিস নং ২০৪৪)

ঐশীগ্রন্থগুলো যদি নবী-রাসূলদের স্বজাতির ভাষা বৈ অন্য ভাষায় নাজিল হতো তাহলে মহিমান্নিত এই গ্রন্থগুলো নাজিলের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতো। সত্য সুন্দরের পথ প্রদর্শন ও মর্ম অনুধাবনের পরিবর্তে পরম শ্রদ্ধাভরে গ্রন্থ আলমিরাতে সাজানো বৈ আর কোনো লাভ হতো না। আল্লাহ প্রদত্ত এই ঐশীগ্রন্থগুলো নাজিলের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মর্মার্থ বুঝে।

বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ ঘটানোর ইরশাদ হচ্ছে- আমি যদি কোরআন অনারবদের ভাষায় অবতীর্ণ করতাম তাহলে তারা অবশ্যই বলত এর আয়াতগুলো বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়নি কেন? এ কেমন কথা অনারবি কিতাব অথচ আরবি ভাষী রাসূল। (সূরা-হামীম আস সাজদাহ আয়াত ৪৪)

ইরশাদ হচ্ছে- (হে নবী) কোরআনকে আমি আপনার নিজের ভাষায় সহজ করে নাজিল করেছি। যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা দুখান আয়াত ৫৮)

মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সহিফায় মাতৃভাষার গুরুত্ব এভাবে বোঝানো হয়েছে- জ্ঞানীদের উচিত তার ভাষা ও সাহিত্যের সংরক্ষণ করা। প্রখ্যাত মুসলিম সমাজবিজ্ঞানী আল্লামা খালদুন বলেন, ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষার মাধ্যম তার মাতৃভাষা হওয়া উচিত। অপর ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ শিক্ষারই নামান্তর।

মাতৃভাষা গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে আওলাদে রাসূল হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) বলেন, যতক্ষণ না তোমরা নিজ ভাষা সাহিত্যের অঙ্গনে বলিষ্ঠ ভূমিকা না রাখবে, ততক্ষণ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। নিজ ভাষা সাহিত্যে অগ্রণী ভূমিকা রাখার ফলেই শেখ সাদী, আল্লামা রুমি, জামি, আল্লামা ইকবালরা হয়েছেন বিশ্ববরণ্য। ইতিহাসে আজ তারা চিরস্মরণীয়। আফসোস, স্বাধীনতার পরে এই দীর্ঘ সময়ে ও বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে এমন প্রতিষ্ঠিত কোনো আলেম খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জাতিগতভাবে আমরা মুসলমান। ভাষাগতভাবে বাঙালি। বাংলা আমার মায়ের ভাষা, সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউলদের তাজা রক্তের পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে এ ভাষা আমরা অর্জন করেছি। এ ভাষা শুধু কিছু বর্ণের সমাহার নয়, এ ভাষা আমাদের আত্মার অংশ। মুসলিম বাঙালি হিসেবে এ ভাষার লালন, চর্চা, সমৃদ্ধ করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব।

ইতিহাস সাক্ষ্য প্রদান করে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের হাত ধরেই ১৯৭১ সালে বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা পাই আমরা, স্বাধীনতা পেয়েছি সেই কবে। কিন্তু পারিনি আমাদের ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে। আজও পারিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে।

মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক মায়ই এখন আর তার আদরের সোনামণিকে বাংলা মাধ্যমে পড়াতে চান না। সবাই বিলেতি ভাষা শিখাতে আগ্রহী। বাংলায় পড়াবেনই বা কেন? উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির বাজার সব ক্ষেত্রেই তো এখন বিলেতি ভাষার জয়জয়কার।

শুধু ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবোধ বুঁদবুঁদ করে ওঠে। একুশে বইমেলায় কয়েকটি বই কেনা আর বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সেলফি তুলতেই সেই চেতনার বুঁদবুঁদি হাওয়ায় মিশে যায়। তরুণ প্রজন্মের একাংশ তো প্রমিত বাংলা বলা অনেকটা ভুলতে বসেছে। তারা এখন বাংলিশ বলতে অভ্যস্ত। দশ শব্দের একটি বাক্যের ছয় থেকে সাতটিই ভিনদেশি শব্দ। এটাকেই তারা আধুনিকতা ভাবে। হালের ফ্যাশন মনে করে। আফসোস যে ভাষার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রক্ষা করেছিল মায়ের মুখের ভাষাকে। আজ সেই তরুণরাই বাংলাকে বিকৃত করে চলছে ফ্যাশন ভেবে।

লেখক : প্রভাষক, রায়হান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আজিমপুর

আপনার মন্তব্য লিখুন