কোন মুসলিম কি ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বা ‘সেকুলারিজমে’ বিশ্বাসী হতে পারবে?

80 Views

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বনাম ইসলাম

বাংলাদেশে “সেকুলারিজমের” অনুবাদ করা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’।
কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল অনুবাদ।
“ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ” অর্থ দ্বারা সেকুলারিজমের প্রকৃত তাত্পর্য প্রকাশ পায় না।

তাহলে “সেকুলারিজম” বলতে কি বুঝায়?

১। সেকুলারিজম নামকরণের প্রথম উদ্যোক্তা Holyoake যিনি Secular Society গঠন করে এর পক্ষে প্রথম আন্দোলন শুরু করেছিলেন,তার লিখিত English Secularism: A Confession of Belief (Chicago 1896)বইয়ে সেকুলারিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ” ‘সেকুলারিজম’ এমন একটি পদ্ধতি, যা শুধু ইহজীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট ও কেবলমাত্র মানবীয় বিবেচনার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এটি তাদের জন্য, যারা ধর্মতত্ত্বকে অস্পষ্ট, অপূর্ণ, অনির্ভরযোগ্য ও অবিশ্বাসযোগ্য মনে করে।

সেকুলারিজম’ ও আস্তিকতা পাশাপাশি চলতে পারেনা। তাই আস্তিকবাদী বিশ্বাসের সাথে লড়াই করা ‘সেকুলারিজম’ -এর জন্য অপরিহার্য। অদৃশ্য বিশ্বাস ও মানব প্রগতি পাশাপাশি চলতে পারে না। ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিহত করাই ‘সেকুলারিজম’ -এর কর্তব্য। কেননা এসব কুসংস্কারমূলক ধারনা-বিশ্বাস যতদিন পর্যন্ত পূর্ণ শক্তিতে বিরাজমান থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বস্তুগত উন্নতি লাভ করা কল্পনাতীত হয়ে থাকবে। ধর্ম অজানা জগত নিয়ে কথা বলে। ফলে ইহকালীন বিষয়ে ধর্মের কোন স্থান নেই, যেমন পরকালের ব্যপারে ‘সেকুলারিজম’ -এর কোন বক্তব্য নেই। [ইংল্যান্ডের National Secular Society এর সভাপতি Mr. Charles Bradlaugh রচিত বই Autobiography]


★ সেকুলারিজম’ এমন একটি মতবাদ, যে মতবাদে মানবজাতির ইহজগতের কল্যাণ চিন্তার উপর গড়ে উঠবে এমন এক নৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে থাকবেনা সৃষ্টিকর্তা ও পরকাল বিশ্বাস ভিত্তিক কোন ধরনের বিবেচনা। [Oxford Dictionary]

★ ‘সেকুলারিজম’ হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন যা সকল ধর্ম বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করে। [Encyclopedia বা বিশ্বকোষ]

★ ‘সেকুলারিজম’ এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সাধারণ শিক্ষা ও সামাজিক সংস্থা পরিচালনায় কোন ধরনের ধর্মীয় উপাদান অন্তর্ভুক্ত হবে না। [Encyclopedia বা বিশ্বকোষ]

★ ‘সেকুলারিজম’ এমন একটি মতবাদ যা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিকভাবে পবিত্র বলে বিবেচিত নয়। যা কোন ভাবেই কোন ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি ধর্মীয় আইন-কানুন বহির্ভূত একটি ব্যাবস্থা।[Random House Dictionary of English Language College Edition, Newyork-1968]

★‘সেকুলারিজম’ এমন একটি ব্যবস্থা যার অধীনে নৈতিকতা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মের উপর ভিত্তি করে হবেনা। এটি ইহজাগতিক বা পার্থিব, ধর্মীয় কিংবা আধ্যাত্মিক নয়। [The Advanced Learner’s Dictionary of Current English]

★সমাজ সংগঠন, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে ধর্ম সংশ্লিষ্ট হতে পারবে না এমন বিশ্বাসের নাম হলো ‘সেকুলারিজম’ । [Oxford Advance Learner’s Dictionary]

★‘সেকুলারিজম’ বলতে সেই ব্যবস্থাকে বুঝায় যেখানে মানবকল্যাণ নির্ধারিত হবে যুক্তির মাধ্যমে, ওহী বা ধর্মীয় নির্দেশনার মাধ্যমে নয়। আর যুক্তি পরিক্ষিত হবে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। [Encyclopedia of Religion & Ethics]

★‘সেকুলারিজম’ বলতে বুঝায় নৈতিকতা ও শিক্ষা ধর্ম কেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় এই মতবাদ।[বাংলা একাডেমী কর্তৃক সংকলিত ও প্রকাশিত English-Bengali Dictionary]

‘সেকুলারিজম’ আর নাস্তিকতা যে একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ উপরের আলোচনায় পর এ ব্যাপারে আর কোন বিতর্কের অবকাশ নাই।

ধর্মনিরপেক্ষতা, সেকুলারিজম এর নামে মানুষকে ইসলামের শিক্ষা থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে,

বলা হচ্ছে, ‘ইসলামে কোন রাজনীতি নেই, কিংবা রাজনীতিতে ইসলাম নিয়ে আসার মানে হল সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা’।

এদের একটি ধোঁকাবাজিপূর্ণ স্লোগান হচ্ছে ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’; অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাসকারী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তারা আশ্রয় নেয় মানুষের রচিত কিছু আইন কানুন ও বিধানের।

এখন প্রশ্ন হল কোন মুসলিম তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বা সেকুলারিজমে বিশ্বাসী হতে পারবে কিনা?

কোরআন ও হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে কোন মুসলিম সেকুলারিজমে বিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ নেই।

এখন দেখুন কুরআন এ ব্যপারে কি নির্দেশনা দিয়েছে —

★তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে।

আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।

(সূরা আল বাক্বারাহ , আয়াত : ৮৫)

★যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী আইন পরিচালনা করে না, তারাই কাফের।

(সুরা আল মায়েদাহ আয়াতঃ৪৪)

★যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।

(সুরা আল মায়েদাহ আয়াতঃ৪৫)

★আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই পাপাচারী।

(সুরা আল মায়েদাহ আয়াতঃ৪৭)

★তারপর হে মুহাম্মাদ ! তোমাদের প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি, যা সত্য নিয়ে এসেছে এবং আল কিতাবের মধ্য থেকে তার সামনে যা কিছু বর্তমান আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী ও তার সংরক্ষক৷ কাজেই তুমি আল্লাহর নাযিল করা আইনি অনুযায়ী লোকদের বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করো এবং যে সত্য তোমার কাছে এসেছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না৷ তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি শরীয়াত ও একটি কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে রেখেছি৷

(সুরা আল মায়েদাহ আয়াতঃ৪৮)

★কাজেই হে মুহাম্মাদ ! তুমি আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী তাদের যাবতীয় বিষয়ের ফায়সালা করো এবং তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করো না৷ সাবধান হয়ে যাও, এরা যেন তোমাকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করে সেই হেদায়াত থেকে সামান্যতমও বিচ্যুত করতে না পারে, যা আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করছেন৷ যদি এরা এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে জেনে রাখো, আল্লাহ এদের কোন কোন গোনাহর কারণে এদেরকে বিপদে ফেলার সিদ্ধান্তই করে ফেলেছেন৷ আর যথার্থই এদের অধিকাংশ ফাসেক৷

(সুরা আল মায়েদাহ আয়াতঃ৪৯)

★(যদি এরা আল্লাহর আইন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়) তাহলে কি এরা আবার সেই জাহেলিয়াতের ফায়সালা চায় ? অথচ যারা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারী তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর চাইতে ভাল ফায়সালাকারী আর কেউ নেই ৷

(সুরা আল মায়েদাহ আয়াতঃ৫০)

এবার আমাদের রাষ্ট্র বাবস্থায় তাকিয়ে দেখুন আল্লাহর ফায়সালা অনুসারে অর্থনীতি , বিচার বাবস্থা ইত্যাদি চলছে কিনা অথচ ইসলামের নিজস্ব রাষ্ট্র, অর্থ ও বিচার বাবস্থা আছে।বিস্তারিত জানতে আল্লাহর রাসুল (সা ) ও চার খলীফার আমলের রাষ্ট্র বাবস্থা কেমন ছিল তা অধ্যয়ন করুন।

অতএব ধর্মনিরপেক্ষতা, সেকুলারিজম সুস্পষ্ট কুফরি।এ ব্যাপারে বিশ্বের সমস্ত আলেম- উলামা ইসলামী স্কলারগণ একমত। এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই।কোন মুসলিম কখনও ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারেনা।

এক শ্রেণীর মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ি মিথ্যাবাদীরা বলে বেড়ায় সেকুলারিজম নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা !!!সেকুলারিজম কখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলনা। বরং তখন মুক্তিযুদ্ধকে “জিহাদ” বলেই প্রচার করা হয়েছিল। আর এজন্যই বাংলার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে।


দেখুন এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল কি বলেন,

“আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ একটি মহলের ধারণা – ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা কি হবে তার মীমাংসা হয়ে গেছে। এ ধরণের উদ্ভট খেয়ালী মন্তব্য কেবল দুঃখজনকই নয়, বিবেক এবং জ্ঞান বিবর্জিতও বটে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং নেতৃত্বদানকারী একজন সেক্টর কমাণ্ডার হিসেবে আমি ঐ সকল বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৭১ সালে আমরা বাঙ্গালী জনগন পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক আকস্মিকভাবে চাপিয়ে দেয়া একটি অঘোষিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং রক্ষা করার জন্যই যুদ্ধ করেছি কেবল। এটা ছিল স্বাধীনতা আদায়ের যুদ্ধ, কোন ধর্মযুদ্ধ নয় যে, যুদ্ধ বিজয়ের পরবর্তীকালে বিশেষ কোন ধর্মকে পরাজিত বলে বিবেচনা এবং বর্জন করতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের আওতায় ধর্ম সংকুচিত কিংবা পরাভূত হতে যাবে কেন, কোন যুক্তিতে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মীয় অনুপ্রেরণা মোটেও অনুপস্থিত ছিলনা।

প্রতিটি যোদ্ধার শ্বাসে-নিঃশ্বাসে, রণক্ষেত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে স্মরণ করা হয়েছে মহান স্রষ্টাকে – তার কাছে কামনা – প্রার্থনা করা হয়েছে বিজয়ের জন্য, নিরাপত্তার জন্য।অধিকাংশ যোদ্ধাই যেহেতু ছিল এদেশের সংখ্যাগুরু মসলিম জনগণেরই সন্তান, সেহেতু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বুলেট, মর্টারের সন্মুখে আল্লাহ এবং রসূলই ছিল তাদের ভরসাস্থল। সুতরাং ’৭১ –এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ইসলাম অনুপস্থিত ছিল বলে যারা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, তারা কেবল বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছেন।”

(মেজর (অবঃ) এম এ জলিল, কৈফিয়ত ও কিছু কথা, পঞ্চম প্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২৫-২৬)

সেক্যুলারিজমকে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে প্রচার করে তাদের পরিচয় বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,

“তবু যারা মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় চেতনার অনুপস্থিতি আবিষ্কার করতে চান,

তাদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছেও ছিল না।”

অতএব , হে যুবক বন্ধু মুক্তি চাও কি?

মানব রচিত সকল মতবাদই ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। মানব রচিত কোন মতবাদই তোমাকে মুক্তির দিশা দিতে পারবেনা। এসো ইসলামের ছায়াতলে। এসো মহা মুক্তির সোপানে।

সাব্বীর আহমাদ
লেখক, সাহিত্যিক, অনলাইন এক্টিভিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন