তবে কি আমরা আলেয়ার আলোর পেছনে ছুটছি? শায়খ আলী হাসান উসামা

25 Views

কে বড়? 

এ মাটিতে বড়’র কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা আজ অবধি কেউ দিতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই। মাওলানা সা’দ বিতর্কিত কথাগুলো ইদানীং বলা শুরু করেছেন, বিষয়টা এমন নয়। এর বহু আগ থেকেই তার বিতর্কিত কথা শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত। তাই দারুল উলুমের ফতোয়া পেয়ে মোটেও অবাক হইনি।

এসকল সাহসী পদক্ষেপই দারুল উলুমকে স্বকীয় করে তোলে, দেওবান্দিয়াতের চেতনার দাবিদার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তার পার্থক্যরেখা স্পষ্ট করে। চেতনার বুলি সবাই আওড়াতে পারে; কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ শুধু সিংহরাই ফেলতে পারে। মুরগির বাচ্চারা ডিম থেকে বেরিয়েই খাবার খাওয়া শিখে ফেলে, বানরকুল জন্ম হয়েই গাছে গাছে লাফাতে থাকে; শুধু মানুষই ফরজ-ওয়াজিব, হারাম-নাজায়িয, আলো-আঁধার চিনতে গেলেও মা’র দিকে তাকিয়ে থাকে। হ্যাঁ, কিছু প্রবীণ দূরদর্শী মানুষ আগেও বলেছিলেন, উম্মাহকে সতর্ক করেছিলেন; কিন্তু তা খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, বাতাসের মতো স্পর্শ বুলিয়েই আবার কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

দেওবন্দের ফতোয়া আসার আগে মাওলানা সা’দের বিতর্কিত কথাগুলোর সমালোচনা করা হলে আকাবিরশিপের প্রলেপ দিয়ে আস্তে করে মুছে দেওয়া হতো। এটাকে এগুতে দেওয়া হতো না। কিন্তু উপরের নির্দেশ আসার পর আজ তিনি এই-সেই কতকিছু। এতকাল যিনি ছিলেন চোখের মণি, রাতারাতি তিনি হয়ে গেলেন ইহুদি-খ্রিষ্টানের দালাল, গোমরাহ, ভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাহোক, এই ব্যক্তিকে নিয়ে আমার মাথাঘামানোর কিছু নেই। তাকে কোনোদিনও ভালো লাগেনি। পার্থক্য এতটুকু, সে সময় ভালো না লাগলেও সবার ভালো লাগার সামনে তা মিইয়ে থাকত। আর এখন অবস্থা বদলেছে। যারা একসময় তাকে উচ্চস্তর আকাবির বানিয়ে রেখেছিল, তারা আজ বুলি পালটে তার সাফাইয়ের পরিবর্তে নোংরা ভাষায় গালাগাল করছে। অথচ এদের অধিকাংশই জানে না, তার মূল ভ্রান্তি কী। যা জানে, তার অধিকাংশই শোনাশোনা, পুরোটা ধারণা ভাসাভাসা।

উপরের নির্দেশ ছাড়া আসলে কিছু হয় না। নিচের মানুষগুলো আসলে মানুষ নয়; কেমন যেন রোবট বা পুতুল; যার রিমোট অন্য কোথাও। আমাদের দেশে একটা অঙ্গনে এটা খুব চলে। তারা যা কিছুই করে, সবকিছুকে বৈধতা দিয়ে দেওয়া হয় শুধু একটা কথা বলে, উপরের নির্দেশ।

মাত্র দুবছর আগে মৌলবি ফরিদের ফতোয়া খণ্ডনের কারণে সে কী খড়গ নেমে এসেছিল, আজও তা ভুলি নাই। এখন চিত্র পাল্টেছে। কোলের শিশুও তাকে আচ্ছারকম গালমন্দ করে। বুঝেও করে, না বুঝেও করে। সুযোগ পেলেই একগাদা ট্যাগ ছুড়ে দেয়। এতে কেউ তাকে কিছু বলেও না। সে কোনো বেয়াদব ট্যাগ খায় না।

এর কারণ হলো, মৌলবি ফরিদ দীনের বিকৃতি করেই ক্ষান্ত হয়নি; যদি হতো, তাহলে এ মাটিতে তার সমস্যা ছিল না। সে বরং একধাপ আগ বেড়ে অধিক সংখ্যক বড়’র পথ থেকে সরে গিয়ে নিজস্ব এক পথ তৈরি করেছে, জুমহুর বড়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে, আর দু-চারজন বড় তার ব্যাপারে মুখও খুলেছে। তাই আজ এই লোকের গোমরাহি তারকার মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, অধিকাংশ মানুষই যে ব্যাপারে একমত। হ্যাঁ, যাদের অন্তর মোহরমারা, বা যারা জ্ঞান ও বোধবুদ্ধিশূন্য, তাদের বিষয় আলাদা।

যাহোক, জঙ্গিবাদ যেমন অস্পষ্ট শব্দ। এর কোনো সংজ্ঞা নেই। যার কারণে কেউ একে মাথায় তুলে নাচে, আর কেউ-বা ঝাড়ুর মাথায় রাখে। কবিরা একবার জঙ্গিবাদের জয়গান গায়, আবার কিছুকাল পর সেই একই কবি জঙ্গি মারে, জঙ্গি ধরে, জঙ্গি ভরে জেলে। বড়’র দশাও অনেকটা তাই।

কী করলে মানুষ বড় হয়?

দাড়ি-চুল পাকলে?
কোনো পীরের খিলাফাত পেলে?
কোনো মাদরাসার মুহতামিম পদে আসীন হলে?
ভালো বক্তা বা লেখক হলে?
ছাত্র জামানায় ফলাফল ভালো করলে?
উল্টোপাল্টা কিছু ফতোয়া ঝাড়লে?
বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু সমর্থক ও ভক্ত জুটিয়ে নিলে?
বই লিখে বড় কারও দুয়া বা ভূমিকা নিলে?
যেকোনোভাবে প্রসিদ্ধি বা খ্যাতি মিলে গেলে?

এ শব্দের স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই বলেই বড়রাও বড়দের কথা বলে আলোচনার সমাপ্তি টানেন; কিন্তু কেন যেন মানুষ সারাদেশ খুঁজেও তার চেয়ে বড় কাউকে খুঁজে পায় না। কোনটা ফরজ আর কোনটা ওয়াজিব, এই ফায়সালাও রেখে দেওয়া হয় কল্পিত কোনো বড়’র জন্য। সুন্নত-মুস্তাহাবের হাজারো-লাখো ফতোয়া দেওয়া হলেও হালের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের ফরজ-ওয়াজিব ও হারাম-নাজায়িযের ফতোয়া কোনো জায়গা থেকেই প্রকাশিত হতে দেখা যায় না। মৌখিক জিজ্ঞাসার জবাবেও বড়দের প্রতি হাওয়ালা করা হয়। কিন্তু সেই বড় আসলে কে, তা জিজ্ঞাসাকারী জানে না। জানার সুযোগও নেই।

ছাত্রের জন্য তার উস্তাদ বড়। সন্তানের জন্য তার বাবা বড়। নাতির জন্য তার দাদা বড়। এখন কি জীবিত দুই-তিন স্তরের মানুষের মধ্যে পুরোনো প্রজন্মের কথাই ইলমের ক্ষেত্রে অধিক গ্রহণীয় হবে? পুরোনো প্রজন্ম জীবিত থাকতে নতুনদের জন্য কি কুরআন-হাদিস ঘাঁটা নিষিদ্ধ থাকবে? বয়স্কদের কথাই কি সবক্ষেত্রে অধিক বিশুদ্ধ হবে? যুবকদের কথাই কি সর্বদা ভুল হবে? আল্লাহ এবং তার রাসুলের বিধানকেও কি কারও মাধ্যমে জাস্টিফাই করে নিতে হবে? আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও কি এসব অজুহাত তালাশ করা সিদ্ধ থাকবে?

জানি না। বুঝি না। জানতে চাই না। বুঝতে চাই না। যারা আস্থার কেন্দ্রবিন্দু, তারাও যখন দীনের মৌলিক বিষয়ে নিজেরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখেন না; বরং কল্পিত কোনো সত্তার দিকে সবকিছুকে ফরওয়ার্ড করেন, তখন ভেতরে আশঙ্কা জাগে, চোখে বোখারা-সমরকন্দ-তাশকন্দের চিত্র ভেসে ওঠে, হালের আরাকানের সঙ্গে আমি এর মিল খুঁজে পাই।

আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না। কান্নাই যদি সবকিছুর সমাধান করতে পারত তাহলে না হয় কেঁদে কেঁদে বুক ভাসতাম, অশ্রুর নোনাজল না হয় রুটিন করে সকাল-সন্ধ্যা গায়ে মাখাতাম। কিন্তু…

 

দীন বড় না ব্যক্তি বড়?   

যারা প্রতিনিয়ত মাওলানা সা’দ কিংবা মৌলবি ফরিদ নিয়ে জগতকে তোলপাড় করে চলছে, দিনে-রাতে কিংবা ঘণ্টায়-ঘণ্টায় তাদের গালাগাল-সংবলিত পোস্ট দিয়ে ফেবুপাড়া গরম করে তুলছে এবং ইদানীংকালে তাদের ফেবু ব্যবহারের অনন্য ব্রতকর্ম হিসেবে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, সংশ্লিষ্টতায়-অসংশ্লিষ্টতায় এদের মানহানি করাকেই গ্রহণ করেছে, কেন যেন তাদের অধিকাংশকেই আমার পছন্দ হয় না। অধিকাংশ শব্দ এ জন্য ব্যবহার করলাম, কারণ সকলের মানসিকতা এক নয়। তাই তাদের মধ্যে অনেকের মানসিকতা হয়তো ভালো। তবে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষের মানসিকতা আদতেই প্রশ্নবিদ্ধ।

মাওলানা সা’দের ইমারাত নিয়ে এতকাল তো টানাহেঁচড়া হয়নি। এখন কেন হচ্ছে? নিশ্চয় এর মূলে হলো তার সেসকল অপব্যাখ্যা, যা তার ভেতর ব্যাধির মতো ছড়িয়ে আছে এবং আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। এখন কথা হলো, এই মেহনতের আরও শত, বরং হাজারো ঊর্ধ্বস্তন ব্যক্তিও তো এসকল অপব্যাখ্যায় আক্রান্ত। তাদের নিয়ে কেন টু শব্দও উচ্চারণ করা হয় না? তাদের ব্যাপারে কেন উম্মাহকে সতর্ক করা হয় না? অথচ তারা সকলেই সমঅপরাধী। এমনকি দারুল উলুমের ফতোয়া আসার আগে মাওলানা সা’দকে নিয়েই কেন এসকল ভাইয়েরা টাইমলাইন গরম করতেন না! তখন কেন মুখে কুলুপ এঁটে রাখতেন? তবে কি উপরের নির্দেশ আসার আগে যেকোনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে এরা চুলপাকনা হিসেবে মূল্যায়ন করেন? দীনের স্পষ্ট ক্ষতি হতে দেখেও তারা কি নিষ্ক্রিয়তার মানহাজ আঁকড়ে রাখাকেই কি নিজেদের আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেন?

একই কথা মৌলবি ফরিদের ক্ষেত্রেও। কওমি অঙ্গনে ফরীদের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? এর পরিমাণ কত শতাংশই বা হবে? আজকাল তো মকতবের ছেলেপেলেও ফরীদ নামের প্রতি আশৈশব ঘৃণা লালন করে। এরপরও তাকে নিয়ে এত উচ্চবাচ্য! যাক, এই উচ্চবাচ্য তো মন্দ নয়। যদিও অযথা গালিগালাজ করা কিংবা তার ওপর এমন দোষও চাপানো, যা থেকে সে মুক্ত, কতটুকু যৌক্তিক, তা বিবেচনার দাবি রাখে। তবে কথা এটা নয়। কথা হলো, এই অঙ্গনে তারচে বহুগুণ বেশি গ্রহণযোগ্যতার অধিকারী অনেকজনও তো সমঅপরাধে অপরাধী। বরং কারও কারও অপরাধের মাত্রা তারচেয়েও বেশি। তবে তাদের ব্যাপারে কেন নীরবতা? কেন এই অবাককরা মৌনতা? এমনকি যারা সেগুলো চিহ্নিত করার প্রয়াস পায়, তাদের নিয়েই কিনা অযথা টানাহেঁচড়া?

হ্যাঁ, এদের বিরোধিতার কারণ দুটো হতে পারে :

১. তারা কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা করেছে এবং দীনের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
২. তারা অধিকাংশ বড়’র পথ-মত থেকে সরে গিয়ে ভিন্ন পথ-মত রচনা করেছে।

যদি বিরোধিতার কারণ দ্বিতীয়টি হয় তাহলে তো ঠিক আছে। এ ক্ষেত্রে আর বলার কিছু নেই। শুধু মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে রাখা প্রয়োজন যে, ওরা কারা, যারা দীনের স্বঘোষিত ঠিকাদার হওয়া সত্ত্বেও যাদের কাছে দীনের থেকে অঙ্গন বড়, বাপ-দাদা-উস্তাদ-মুরুব্বির পক্ষ-বিপক্ষের গুরুত্ব বড়!

আর যদি বিরোধিতার কারণ প্রথমটা হয় তাহলে নির্ঘাত এ মানুষগুলো ডাবল স্ট্যান্ডার্ডবাজিতে আক্রান্ত। যারা ‘মিল্লাতে ইবরাহিমের জাগরণ’ বা ‘রাজদরবারে আলিমদের গমন’ পড়েছেন, আলিমগণের প্রকারভেদ সম্পর্কে তাদের জানা থাকার কথা। তো এ মানুষগুলো উলামায়ে মিল্লাহ নয়; বরং এরা হলো উলামায়ে উম্মাহ। এরা সেসব বিষয়েই কথা বলে, যেসব বিষয়ে জনসমর্থন পাওয়া যায় এবং তাতে মানুষের ঝোঁকপ্রবণতা থাকে। তারা পেছন থেকে সাপোর্ট পেলেই কেবল তোতাপাখির মতো মুখ খুলে।

অন্যদিকে যদি কোনো বিষয় এমন হয় যে, তা নিয়ে মুখ না খুললে দীনের স্পষ্ট ক্ষতি হওয়ার দুয়ার খোলা থাকে, কিন্তু সেসব ব্যাপারে টু শব্দ উচ্চারণ করলে জনপ্রিয়তা হারানোর আশংকা থাকে, তাহলে এই শ্রেণির উলামা সে ক্ষেত্রে হিকমাতের দোহাই দিয়ে নিজেদের মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। আদতে তারা রহমানের বন্দেগি চায় না; তারা চায় ইনসানের সন্তুষ্টি। এদের থেকে সাবধান থাকতে হয়। নইলে এরা উম্মাহকে সে পথেই পরিচালিত করে, যে দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ও ব্যাকআপ থাকে। তারা সবক্ষেত্রে মানুষকে সে পথে পরিচালিত করে না, যা আল্লাহ এবং তার রাসুলের পথ। এদের অনুসরণ কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছালেও কিছু ক্ষেত্রে আবার নিয়ে যায় গোমরাহির তমসাচ্ছন্ন পথে।

হজ ভী কিয়া কা’বা কা,
গঙ্গা কা আশনান ভী।
রাজি রাহে রাহমান ভী,
খোশ রাহে শয়তান ভী।

জানি, কথাগুলো স্রোতের বিপরীত। তারপরও বলার ছিল। তাই বলতে হলো।

আপনার মন্তব্য লিখুন