অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা | নোমান সাদী

Noman Sadi

নতুন ব্লগার
#1
20190908_193117-jpg.349

সকাল থেকেই সবখানে উৎসবের আমেজ। লাল-সাদা শাড়ি কিংবা পাঞ্জাবিতে রমনায় হাজারো মানুষের ঢল ।
প্রিয়জনের সাথে সবাই ব্যস্ত বৈশাখের এই আনন্দটুকু লুটে নিতে।
রাস্তায় হকাররা ব্যস্ত নিজের মালামাল বিক্রিতে।
যায়গায় যায়গায় বৈশাখী অনুষ্ঠান, নাচে গানে জমিয়ে তুলতে বৈশাখী মেলা। দল বেঁধে মানুষ যোগ দিচ্ছে সেইসব অনুষ্ঠানে।

এরই মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলছে শামীম। তার এক পা অবশ তাই ক্র্যাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। মাথায় ময়লা একটা টুপি , পরনে পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি । এই বৈশাখী অনুষ্ঠান, এই নাচ-গান তার উপর কোনো প্রভাব ফেলছে না। গান তার পছন্দ নয় তবু এই গানের মাঝে দিয়ে তাকে হাঁটতে হচ্ছে।
সে এখানে এসেছে হুজুরের আদেশে। এতিমখানার জন্য সাহায্য চাইতে।বৈশাখের সময় মানুষ বেশি বের হয়, আর পঙ্গু দেখলে মানুষের মায়াও বেশি হয়। তাই হুজুর শামীমকে এই কাজ দিয়েছেন। সে হুজুরের আদেশ মতো কাজ করে চলেছে। যাকে সামনে পাচ্ছে তার কাছেই সাহায্যের আবেদন করছে।

- ভাইয়া এতিমখানার জন্য কিছু সাহায্য করেন। আপু এতিমখানার জন্য কিছু সাহায্য করেন। ছোট ছোট এতিম বাচ্চারা খাবে। তাদের জন্য কিছু...

এই কথাগুলোও হুজুরের শিখিয়ে দেয়া । কেমন মানুষের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইতে হবে , কার কাছে গেলে বেশি সাহায্য পাওয়া যাবে তাও হুজুর শিখিয়ে দিয়েছেন।
সকালে এক প্লেট খিচুড়ি আর এক গ্লাস পানি খেয়ে বের হয়েছে । এখন প্রায় দুপুর ২টা বাজে। খিদেয় পেট ব্যথা করছে, কিন্তু হুজুর স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন আসরের আগ পর্যন্ত একটানা সাহায্য চাইতে। এর মাঝখানে শুধু যোহরের সময় নামাজ পড়ার বিরতি নিতে পারবে। আসরের পরে কোন একটা হোটেল থেকে পঞ্চাশ টাকার মধ্যে কিছু খেয়ে তারপর মাদ্রাসায় ফিরবে।

শামীম আর থাকতে পারছে না । অনেক্ষণ রোদে ঘোরাঘুরি করায় তার মাথাও ব্যথা করছে। কোথাও একটা জায়গা খুঁজে বসতে হবে। কিন্তু কোথায় বসবে ভেবে পাচ্ছে না।
একেবারে কি কোনো হোটেলে গিয়ে বসবে নাকি পার্কের ভেতরে কোন বেঞ্চে বসে পরবে!
কিছু ভেবে না পেয়ে শেষমেশ রাস্তার পাশেই বসে পরলো ।
পাশের একটা ভ্যান থেকে দশ টাকা দিয়ে এক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো পরিচিত কেউ আছে কিনা। কাউকে দেখতে না পেয়ে এক নিঃশ্বাসে শরবতের গ্লাসটা শেষ করলো।
হুজুরের আদেশের বাইরে সে শরবত নিয়েছে। এটা জানতে পারলে হুজুর হয়তো কিছু বলবে না কিন্তু রাগ করতে পারে।
শরবত শেষ করে সে পার্কের পাশে একটা বাথরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে নিলো। মাথায় পানি দিয়ে একটু ঠান্ডা হলো। তারপর আবার বেরিয়ে পরলো সাহায্য চাইতে।

- ভাইয়া এতিমখানার জন্য কিছু সাহায্য করেন। আপু এতিমখানার জন্য কিছু সাহায্য...

কেউ সাহায্য করছে কেউ করছে না, কেউ কেউ আবার সন্দেহ বশত জিজ্ঞেস করছে "কোন মাদ্রাসা থেকে এসেছে? " "মাদ্রাসার নাম বলে ধান্দা করছো নাকি?"
এইসব প্রশ্নে মিশে থাকা অপমান শামীমের গায়ে লাগে না। সে তার মত সাহায্য চাইতে থাকে।

রমনার ভেতরে একের পর এক অনুষ্ঠান হচ্ছে। কোনটা শেষ হচ্ছে তো কোনটা শুরু হচ্ছে।

শামীম বার বার আকাশের দিকে তাকায়। কখন রোদ একটু কমবে। কখন বিকেল হবে। আর ও একটু বিশ্রাম করতে পারবে।

মাঝে একবারে পুলিশ ধরে আদ্যোপান্ত জিজ্ঞাসা করে নিলো।
পার্কের বাইরে ঘুরলে পুলিশের সমস্যা হবে কেন শামীম তা বুঝে পায় না।

বিকেল প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। শামীম ভাবে , এবার কোথাও বসে টাকাগুলো গুনে নেওয়া দরকার। এই বাহানায় আসরের আজান পর্যন্ত বসে থাকা যাবে।
তবে তার চিন্তা হচ্ছে যে টাকা কম হলে হুজুর আবার রাগ করবে কিনা!

শামীমের অবস্থা দেখে তাকে পার্কের ভেতরে ঢুকতে দিলো না গেটে থাকা পুলিশেরা। তাদের ধারণা শামীম ভেতরে গিয়েও টাকা উঠাবে।
শামীম কয়েকবার বুঝিয়ে বলল যে , সে আর টাকা উঠাবে না। তার টাকা উঠানো শেষ। কিন্তু তবুও তারা মানলো না।

ঢুকতে না পেরে শামীম মাদ্রাসার দিকে রওনা দিলো। পথে কোথাও নামাজ পরবে ভেবে হাঁটতে শুরু করলো। শিশু পার্কের কাছে একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পরলো। এখানে বসে টাকা গোনা যাবে। পকেট থেকে টাকা বের করে গুনতে শুরু করলো শামীম।

বারোশো আটত্রিশ টাকা হয়েছে। নেহায়েৎ কম নয়। শামীম সেখান থেকে পঞ্চাশ টাকা আলাদা করে পাঞ্জাবির বাম পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো। আর বাটি টাকাটা আরেকবার গুনে নিলো। এগারোশো আটাশি টাকা।

টাকাটা ডান পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে যাবে এমন সময় কেউ একজন টাকাগুলো হাত থেকে ঝটকা মেরে নিয়ে দৌড় দিল।
শামীম যেন চোখে অন্ধকার দেখে। কী করবে বুঝে পায়না।
ক্র্যাচে ভর দিয়ে কোনমতে ছুটতে থাকে। কিন্তু টাকা নিয়ে লোকটা কোন দিকে গেল?
আতঙ্কে শামীমের কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। হুজুরকে সে কী জবাব দেবে! ডানে বামে তাকিয়ে লোকটাকে খুঁজতে থাকে। লোকটা কি রাস্তার ঐ পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছে? শামীম তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে যায়।
কয়েকটা মোটরসাইকেল তার পাশ দিয়ে চলে যায়। শামীম টাল সামলাতে পারছেনা। ক্র্যাচটা কোনভাবে জাপটে ধরে আছে। আর এক পা আগাতেই সে তার পেটের ডানপাশে প্রচন্ড আঘাত টের পলে।
তার শরীরটা ছিটকে পরলো কয়েকফিট দূরে। শত চেষ্টা করেও ক্র্যাচটা ধরে রাখতে পারলো না।

আশেপাশে চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছে শামীম। কিন্তু সেই চিৎকারের শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসছে। কানের কাছে গরম অনুভব করছে। গরম কিছু একটা বয়ে যাচ্ছে।
চোখ মেলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। শেষবারের মতো মাথাটা ডানে ঘুরালো, যদি চোরটাকে একবার দেখতে পারে।

পরিশিষ্ট : শাহবাগ মোড়ের কাছে একটা ছেলের লাশ পরে আছে।
পাঞ্জাবি আর টুপি দেখে পুলিশ ধারনা করছে লাশটা কোন মাদ্রাসা ছাত্রের হবে। পাশেই এক ক্র্যাচ পরে আছে। ছেলেটা হয়তো খোঁড়া ছিলো। রাস্তা পার হতে গিয়ে কোন গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। মোটরসাইকেল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি কারণ আজকে এদিকে গাড়ি ঢোকা নিষিদ্ধ। পিজি হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স এনে লাশটা নিয়ে যাওয়া হবে। আশেপাশে মানুষের ভিড় জমে গেছে। পুলিশ অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।

দূরের একটা মাইক থেকে বৈশাখের কবিতা আবৃত্তি হচ্ছে।
"এসো হে বৈশাখ,এসো এসো,
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে,
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা,
দূর হয়ে যাক যাক যাক...
 

বর্ণমালা এন্ড্রয়েড এপ

নতুন যুক্ত হয়েছেন

Top