অপেক্ষার প্রহর

#1
মেহেরুন্নেছার ব্লগ

"তমা"
ভালো লাগার মতো একটি নাম। নদীর ধারে বিকাল বেলায়, দেখা মেলেছিল সেই রূপবতী তমা নামের মেয়েটির সাথে। অফিস থেকে গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে বাবা-মায়ের সাথে গিয়েছিলাম গ্রামের বাড়ি। সেই ছোট বেলায় একবার এসে নদীতে ডুবে মরতে-মরতে বেঁচে উঠেছিলাম সেদিন। কখনো নদী দেখিনি বলে আনন্দে একাই নেমেছিলাম গোসল করতে। হঠাৎ করে নদীর বিশাল ঢেউয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে মাঝখানে চলে গিয়েছিলাম আমি।
এরপর গ্রামের কিছু লোক আমায় অজ্ঞান অবস্থায় দেখে বাসায় নিয়ে আসে। মা তো খুব কান্নাকাটি শুরু করেছিল। জ্ঞান ফিরতেই মায়ের কাছে হেব্বি বকা খেয়েছিলাম সেদিন।
__ইঁচড়ে পাকা ছেলে একটা। সবসময় শুধু পাকামী করা? এখন যদি কিছু হয়ে যেত?
বলেই মা আবার কান্না জুড়ে দিয়েছিল।
সেই থেকে গ্রামের বাড়িতে আসতে বড্ড ভয় হত আমার। এবার বাবা মা অনেকটা জোর করেই নিয়ে এসেছে। যেহেতু এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। তাই আর কোন ভয় নেই।
আর এসেই তমা কে প্রথম দেখার পর মনে হয়েছিল গ্রামে আসাটা আমার স্বার্থক হল। মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে এক দেখায় ভালো লেগেছিল তাকে। কালো মেঘের মত লম্বা চুলগুলো খোঁপা করে রজনীগন্ধার মালাটা জড়িয়েছিল সে। মুক্ত ঝরা হাসি দিয়ে হেঁটে চলেছিল সাদা কাঁশ বনের দ্বার ঘেঁষে। আহা দেখতে যেনো ওই আসমানের পরী। সে পরী যেন নেমে এসেছে আমার সামনেই।
.....
লজ্জা ভেঙ্গে বাবা-মাকে নদীর ধারে দেখা সেই পরীর কথা বলেছিলাম সেদিন।
অনেক খোঁজ নিয়ে বাবা ঘটককে পাঠিয়ে দিল তমাদের বাড়ি। বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করার জন্য যখন তমাদের বাড়িতে আমরা সবাই যাই। তখন একটা পুচকি মেয়ে এসে আমার হাতে চিরকুট দিয়ে বলল তমা আপু পাঠিয়েছে।
চিরকুটটা পেয়ে একটু ভয় পেয়েছিলাম আমি। কী লিখতে কী লিখেছে কে জানে? কাগজটা খোলার পর আমি একটু মুচকি হেসে অপর পৃষ্ঠায় লিখে দিলাম সেটা কোন বিষয় নয়, আমি শুধু জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাই আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাই না, বুঝতেও চাই না।
বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান বলে কথা, তাই খুব ধুম-ধাম করেই তমা আর আমার বিয়েটা সম্পূর্ণ হল।
......
হুম আমি এখন হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আজিমপুর কবর স্থানে। তমাকে দেবো বলেই এখানে আসা। তমার প্রত্যেক মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে রজনীগন্ধা নিয়ে এইখানে হাজির হই আমি। অভ্যসে পরিণত হয়ে গেছে এটা। কারণ তমার সবচেয়ে পছন্দের ফুল ছিল এই রজনীগন্ধাগুলো।
পূর্বের কথাগুলো ভাবতে-ভাবতে কখন যে চোখটা ঝাপসা হয়ে এসেছে বুঝতেই পারিনি। মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুলে চোখ দুটোকে মুছতে-মুছতে ফুলের তোরাটা রেখে দিলাম তমার কবরের উপর। আজ তমার ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই ৪৩বছরে আমার উপরটা অনেকটা বদলালেও, বদলাইনি ভিতরটা। আজও এক বিন্দুও কমতে দেইনি তমার জন্য আমার ভালোবাসাগুলো। তমার জায়গায় অন্য কেউ এসেছে ঠিকি, কিন্তু তমার জায়গাটা সে নিতে পারেনি কখনো।
.......
আজীমপুর কবর স্থান থেকে হাঁটতে-হাঁটতে চলে এসেছি অনেকটা পথ। আবার পূর্বের ভাবনায় ফিরে গেলাম আমি।
সেদিন আমার আর তমার বাসর ঘরটা সাঁজানো হয়েছিল রজনীগন্ধা আর তাঁজা ফুটোন্ত গোলাপ দিয়ে। বাড়িটা কেমন জানি নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এক মূহূর্তে। বিয়ে বাড়ি হঠাৎ করে মৃত বাড়ির সমান হওয়ার কারণটা আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তখন।
মুরুব্বীরা একজন আরেকজনের সাথে কী যেন বলাবলি করছিল? আমি সেদিকে তেমন পাত্তা না দিয়ে নিজের রুমে যেতে লাগলাম। তবে ফুলের গন্ধটা ছড়িয়ে আছে পুরো বাড়ি জোড়ে। মনটাও খুব ভালো ছিল সেদিন, থাকবেই না কেন? পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করতে পেরেছি এর থেকে বেশি আর কি চাওয়া থাকতে পারে আমার? নিজের রুমের দিকে আগাচ্ছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে মা বলে উঠলো আরফান কোথায় যাস?
ছেলে হয়ে মায়ের এমন প্রশ্নের ঠিক কী উত্তর দেওয়া উচিত তা আমার জানা নেই। মা বললো তুই ঐ ঘরে যেতে পারবি না।
ছোট করে একটা প্রশ্ন করা ছাড়া আর কী বলবো বুঝে উঠতে না পেরে বলেই উঠলাম কেন মা?
মায়ের কথায় সেদিন আমার মাথায়
আকাশ ভেঙে পড়েছিল । কি বলছে মা এসব? আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছি না।

___আরফান তুই আমার একমাত্র সন্তান। সেই তুই কি করে পারলি কথা বলতে না পারা একটা মেয়েকে বিয়ে করতে?
___কথা বলতে পারে না মানে??? কি বলছ এইসব? তমা কী তাহলে সত্যি বাকপ্রতিবন্ধী???
___তারমানে তুই আগেই জানতি?
___মা আমি সত্যি বলছি আমি সেদিন বিশ্বাস করিনি, যেদিন তমা তার ছোট বোনকে দিয়ে চিরকুটে লিখেছিলো আমার কথা বলার ক্ষমতা নেই। আমি ভেবেছিলাম ও মজা করে লিখেছে। কে বলবে মা এমন একটা সুন্দর মেয়ে সে নাকি কথা বলতে পারে না? কে বিশ্বাস করবে এই কথাটা?

___তোর উচিত হয়নি বাবা এই বিয়েটা করার। দেখ আমি বাসায় একা থাকি। তুই তোর বাবা বেড়িয়ে যাস সকালে আর আসিস রাতে। মাঝখানের এতটা সময় আমি একা থাকি বলেই তোকে বিয়ে দিতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ এমন একটা মেয়ে আমার ছেলের বউ হল যে কিনা কথাই বলতে পারেনা। বিয়ের সময় যখন মেয়ে মুখে কবুল বলতে না পেরে খাতায় লিখে দিলো কবুল, তুই বল এই বিয়ে কোনো বিয়ে হল?
___মা এখন কি করব বল? আর তো কিছু করার নেই?
___কে বলেছে কিছু করার নেই? তুই এই মেয়েকে এই মূহূর্তে আমার বাসা থেকে বের করে দে। আমি বলছি তুই এই মেয়েকে ডিভোর্স দিবি?
___মা !! কী বলছো এইসব? ও কথা বলতে পারে না বলে তুমি ওকে এত বড় শাস্তি দিতে পার না।
___নামায আদায় করিস, হাদীস পড়িস এইটা জানিস না বাবা মায়ের হুকুম পালন করা সন্তানের কর্ত্বব্য? যদি বিবাহিত স্ত্রী কেও তালাক দিতে বলে তাই করতে হয়!
___মা গো। সবই জানি গো মা। কিন্তু এইটা তো অন্যায়। আল-কুরআনে এইটাও আমার আল্লাহ্ বলেছে ইসলাম শরীয়তে হালাল কাজের মধ্য দুটো কাজ সব থেকে নিকৃষ্ট আর তা হল তালাক দেওয়া ও ভিক্ষে করা।
মা গো যেখানে আমার আল্লাহ্ আল-কুরআনে ঘোষণা করে দিয়েছে হালাল হলেও তালাক দেওয়া সবচেয়ে নিকৃষ্ট একটা কাজ, আমি জেনে বুঝে কি ভাবে সে কাজ করতে পারি বলতে পার তুমি???
.....
সেদিন মাকে বুঝাতে পারিনি আমি। ব্যর্থ স্বামী হয়ে রাতেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম তমাকে। বুকের ভেতরটা কষ্টে যন্ত্রণায় ভরে গিয়েছিল আমার। তমাকে আর ডিভোর্স দেওয়া হয়নি। কারণ তমা ডিভোর্স পেপারে সাইন করেনি। বাবা মায়ের পছন্দে আবার বিয়ে করতে হল আমাকে। রুকু চলে আসল আমার ঘরে। রুমটা আবারও সাঁজানো হয়েছিল নানারকম ফুল দিয়ে। তবে আমার সাঁজানো জীবনটা যে অগুছালো হয়ে গিয়েছিল ওই দিনই, যেদিন বাধ্য ছেলে হয়ে মায়ের কথা রাখতে আমার বিবাহিতা স্ত্রীকে বিয়ের রাতেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম তার গ্রামে।
রুমে যেতে ইচ্ছে করছিল না বলে, বেলকণিতে দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদটা আনমনে দেখছিলাম আমি। হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ আসল। হুম মেসেজটা আর কারোর ছিল না। আমার বিবাহিতা স্ত্রী তমার ছিল।
মেসেজটা ওপেন করতেই ভেসে উঠল।

ওগো শুনছো? তোমাকে তো কিছুই বলা হল না আমার। তার আগেই তো পাঠিয়ে দিলে বাবার বাড়িতে। শুনলাম তুমি নাকি বিয়ে করেছ? যাক ভালই হল। এখন মায়ের সাথে কথা বলার মতো একজন হয়েছে। তবে কী জানো আমিও একদিন কথা বলতে পারতাম। তবে বিধাতা হঠাৎ করেই সেই শক্তি কেড়ে নিলো একটা এক্সিডেন্টের মাধ্যমে।
তুমি যখন সেদিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে অতীথি পাখিগুলোকে দেখছিলে, আমি তখন তোমাকে দেখছিলাম গো। নীল রঙের শার্ট পড়া, চোখে সানগ্লাস আর আঁচড়ানো ছোট চুলগুলো তোমার বাতাসে দোলছিল। সবটাই যেন আমাকে মুগ্ধ করেছে সেদিন। জীবনে প্রথম মনে হয়েছিল স্বপ্নের সেই রাজকুমার আমার আজ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তখন এক মূহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে আমি তোমার যোগ্যই না।
হে গো!!! তুমি খুশি তো? যাক তোমার খুশিতেই আমার খুশি। ভালো থেকো তুমি। এই জীবনে তো আর তোমার সাথে থাকতে পারলাম না। ওই জীবনেই না হয় আল্লাহ্'র কাছ থেকে তোমায় চেয়ে নেবো।
......
কিছুদিন পরেই ফোনে খবর আসলো আমার বউটা ব্রেন্ডটিউমার অপেরশন করতে গিয়ে মারা যায়। সেদিন আমি আরও একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। তমার বাবা মাকে অনেক অনুরোধ করে তার দাফন-কাফন করেছিলাম আমার বাসার পাশের কবর স্থানে। যাতে করে আমি চাইলেই তাকে দেখতে এইখানে আসতে পারি।
এখন আমি বেঁচে আছি শুধু মৃত্যুর অপেক্ষায়। তমার সাথে মিলিত হওয়ার অপেক্ষায়।
"তমা" তোমার অপেক্ষার প্রহর হয়তো ফুরিয়ে এসেছে গো। হয়তো তোমার স্বামী তোমার কাছে যাওয়ার টিকেটটা পেয়েই গেছে। মাত্র আর কয়টা দিন বাকি। তোমাকে আর অপেক্ষা করিয়ে রাখবো না আমি। চলে আসছি খুব তাড়াতাড়ি।

হ্যাঁ সেদিনই আরফান সাহেব এক্সিডেন্টে মারা যায়। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কখন যে মাঝ বরাবর এসে পরেছিল তার আর খেয়াল ছিল না। বয়স বাড়ার সাথে-সাথে কানেও কম শুনতে শুরু করেন তিনি। তাই গাড়ির আসার শব্দ শোনতে না পারার কারণেই তার এক্সিডেন্ট হয়। বৃদ্ধ লোকটাকে রাস্তার সাথে পৃষ্টে দিয়ে দ্রুত গতীতে চলে যায় গাড়িটি। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এঁকে আরফান সাহেব বললো, ___তোমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হল "তমা"।
 

বর্ণমালা এন্ড্রয়েড এপ

নতুন যুক্ত হয়েছেন

Top