• সুখবর........ সুখবর........ সুখবর........ বর্ণমালাকে খুব শিঘ্রই পাওয়া যাবে বাংলা বর্ণমালার ডোমেইন "ডট বাংলায়" অর্থাৎ আমাদের ওয়েব এড্রেস হবে 'বর্ণমালাব্লগ.বাংলা' পাশাপাশি বর্তমান Bornomalablog.com এ ঠিকানায়ও পাওয়া যাবে। বাংলা বর্ণমালায় পূর্ণতা পাবে আমাদের বর্ণমালা।

আলো ।। ইসপিয়াক আহম্মেদ শিমুল

#1
download-jpeg.75

বাসায় কেউ নেই, আমি একা। আনুমানিক রাত দশটার একটু উপরে, খাওয়া শেষ করে হাঁটতে বেড়িয়েছি। বাসায় কেউ থাকলে সেটা সম্ভব হতো না। শহরের এক পাশেই গ্রাম আর হলুদের সমারোহে সরিষা ক্ষেত। খেতের আল বরাবর হেঁটে যাচ্ছি। কুয়াশা পড়তেছে ধীরে ধীরে। একটু একটু করে হাওয়া বইছে খোলা ফসলের প্রান্তরে। হঠাৎ একটা গোঙানির আওয়াজ পেলাম। কিন্তু আশে পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ভাবলাম হয়তো মনের ভুল। কিন্তু একটু পর আবারও সেই আওয়াজ। তাই মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করে, চারদিকে খুঁজতে থাকলাম। কিছুটা সামনে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে পড়ে আছে। শরীরে রক্ত লেগে আছে, নড়তে পারতেছে না। জামার অনেক জায়গায় ছেঁড়া। আমার গায়ের সুয়েটার খোলে, সেটা মেয়েটার গায়ে জড়িয়ে দিলাম। তারপর মেয়েটাকে সেখান থেকে নিয়ে গেলাম সদর হাসপাতালে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে আমার বন্ধু রাফিন'কে ফোন করে ওর আব্বুর ব্যাপারে জেনে নিলাম। আংকেল এখানকার সদর হাসপাতালের ডাক্তার। উনি হাসপাতালেই আছেন। তাই আর ঝামেলা পোহাতে হবে না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আংকেল মেয়েটাকে নিয়ে গেলেন চিকিৎসা করতে। আধ ঘন্টা পর তিনি ফিরে এলেন, কিন্তু মুখটা ফ্যাকাসে।
-- আংকেল, মেয়েটির কী অবস্থা?
-- তার আগে এটা বলো, মেয়েটিকে তুমি চিনো?
-- না আংকেল। আমি হাঁটতে গিয়েছিলাম, গ্রামের ধারে। সেখানেই মেয়েটিকে এই অবস্থায় পাই।
-- ভালই করেছো। আর কিছুটা সময় দেড়ি হলে, মেয়েটির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারতো।
-- কেন আংকেল? কী হয়েছে মেয়েটির সাথে?
-- মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মেয়েটি বাঁচবে। তবে যে আঘাতটা পেয়েছে, সেটা কাটিয়ে উঠতে অনেকটা সময় লাগবে।
-- মেয়েটি কিছু বলেছে আপনাকে?
-- না, এখন সেই অবস্থায় নেই। এক কাজ করো, তুমি এখন বাসায় চলে যাও। আমি নার্সদের বলে দিচ্ছি মেয়েটার খেয়াল রাখতে। চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- আচ্ছা আংকেল।
তারপর হেঁটে হেঁটে চলে এলাম বাসায়।
ভাবতেই অবাক লাগে। আমি আমার বোনকে সব সময় আগলে রাখি, আর অন্যের বোনকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাই। তার সম্মান, সম্ভ্রমের কথা চিন্তা করি না। এটাই আমাদের মনুষ্যত্ব।
পরদিন সকালে হাসপাতালে গেলাম মেয়েটিকে দেখতে। ডাক্তার আংকেল বলেছেন এখন আগের থেকে ভালো আছে অনেকটাই। এভাবেই কেঁটে গেল আরও চার পাঁচটা দিন। মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছে। একদিন মেয়েটি জানতে চেয়েছিল, তাকে কে এনেছে হাসপাতালে? তারপর নার্স এসে আমাকে ভিতরে নিয়ে যায়। মেয়েটি আমাকে দেখে কিছু বলেনি। আমি মেয়েটির কাছে তাঁর নামটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ছোট্ট করে উত্তর দিয়েছিল অদ্রিতা। আর একটা শব্দও করলো না। হয়তো এখনো আমায় বিশ্বাস করতে পারছে না। কেননা আমার মতোই কোনো একজন, যে মানুষরুপী জানোয়ার, সে ওর সাথে এমনটা করেছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে যাই মেয়েটির খোঁজ-খবর নিতে। যেহেতু আমিই মেয়েটিকে হাসপাতালে এনেছি, ওর সব দায়িত্ব এখন আমার। যতদিন না তাকে তাঁর বাড়িতে পাঠাতে পারছি।
মেয়েটিকে হাসপাতালে এনেছি দশ দিনের মতো হয়ে গেছে।
একদিন বসে আছি হাসপাতালের বারান্দায়। ঠিক তখনি আম্মুর কল এলো।
-- বাবা, তুই কোথায়? তাড়াতাড়ি বাসায় আয়, আমরা এসে পড়েছি।
-- আসছি।
তারপর নার্সের সাথে কথা বলে, তাড়াতাড়িই চলে গেলাম বাসায়। কারণ, বাসা তালা দেওয়া। আব্বু, আম্মু, ভাইয়া , ভাবি, কারো কাছেই বাসার চাবি নেই। সবাই বাড়িতে গিয়েছিল, আজ ফিরেছে।
সন্ধ্যায় আবার যাচ্ছি হাসপাতালে। তখনি আম্মু সামনে এসে দাঁড়ালো।
-- এই সন্ধ্যায় কোথায় যাচ্ছিস?
-- হাসপাতালে।
-- হাসপাতালে কেন? কী হয়েছে?
-- চিন্তা করো না আম্মু। আমার কিছুই হয়নি। আমি একটু পরেই চলে আসবো, এসে সব বলবো।
-- আচ্ছা, সাবধানে যাস।
-- হুম।
তারপর হাসপাতালে গিয়ে মেয়েটির খোঁজ-খবর নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। রাত্রে খাওয়ার সময়, সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করতেছে কী হয়েছে? আমি কেন হাসপাতালে গিয়েছিলাম?
-- একটা মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলাম।
-- কে মেয়েটি? ওর সাথে তোর কিসের সম্পর্ক?
আম্মু জানতে চাইলো।
-- নাম অদ্রিতা, এর বেশি কিছু জানিনা। কয়েকদিন আগে, মেয়েটিকে গ্রামের পাশে সরিষার ক্ষেতে পেয়েছিলাম আহত অবস্থায়। তখন মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার বললো, মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
-- এখন কী অবস্থা মেয়েটির?
আব্বু জানতে চাইলো।
-- এখন অনেকটাই সুস্থ আছে।
-- ভালই করেছিস বাবা, মেয়েটিকে বাঁচিয়ে। কাল একবার আমায় নিয়ে যাবি হাসপাতালে? মেয়েটিকে দেখবো।
আম্মু বললো পাশ থেকে।
-- আমিও যাবো মা।
ভাবিও আগ্রহ দেখালো।
-- আচ্ছা, নিয়ে যাবো নে।
পরদিন সকালে আম্মু আর ভাবিকে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। উনারা ভিতরে গিয়ে অনেকক্ষণ কাঁটালেন অদ্রিতার সঙ্গে।
দু'দিন পর হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেওয়া হলো অদ্রিতাকে। আম্মুকে আর ভাবিকে সঙ্গে নিয়ে, অদ্রিতাকে বাসায় নিয়ে এলাম। আমি গেলে হয়তো আসতে চাইতো না, কিন্তু আম্মু আর ভাবি যাওয়াও ভয় পায়নি। বাসার অতিথিদের রুমে ওর থাকার ব্যবস্থা করা হলো। আম্মু আর ভাবি সারাক্ষণ ওর খেয়াল রাখছে, মাঝে মাঝে ডাক্তার আংকেল এসে দেখে যাচ্ছেন।
রাত্রে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।
-- অদ্রিতাকে ওর বাড়িতে পাঠাতে হবে তো নাকি?
পিছনে ফিরে দেখলাম আম্মু।
-- হুম। তুমি ওর সাথে কথা বলে, ওর বাড়ির লোকদের নাম্বার নিয়ে কথা বলো।
-- আচ্ছা।
আম্মু চলে গেলেন। আধ ঘন্টা পর আবার ফিরে এলেন।
-- ওর পরিবারের সাথে কথা বলেছো?
-- হুম।
-- কী বলেছেন উনারা?
-- অদ্রিতার বাবা মা ছোট বেলায় মারা যায়। ও চাচার কাছেই মানুষ হয়েছে। ওকে ওর বিয়ের দিন কিডন্যাপ করা হয়। এই অবস্থায়, ওর চাচা, ওকে আর ফিরিয়ে নিবে না।
-- তাহলে এখন কী করার?
-- ওর তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বাবা। আমাদেরই কিছু একটা ভাবতে হবে।
-- হুম, আম্মু। তোমরাও ভাবো, আমিও ভাবতে থাকি। দেখি কিছু পাই কিনা?
সেদিন আর ভালো করে ঘুম হয়নি। সারারাত চিন্তা করেছি। একটা মেয়েকে যখন বাঁচিয়েছি, তখন তো তাঁকে আর রাস্তায় ফেলে দিতে পারি না?
সকালে খেতে বসেছি। অদ্রিতাকে ওর থাকার রুমেই খাবার দেওয়া হয়।
-- কিছু ভেবেছিস বাবা?
আম্মু জানতে চাইলো।
-- হুম।
-- কী ভেবেছিস?
পাশ থেকে ভাইয়া বললো।
-- তোমাদের আপত্তি না থাকলে, আমি অদ্রিতাকে বিয়ে করতে চাই।
আমার কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল।
-- এটাই ভাবছো তো, একটা ধর্ষিতা মেয়েকে কেন বিয়ে করবো? দেখো, এতে তো ওর কোনো দোষ নেই। আজ আমার একটা বোন থাকলে, তার সাথেও এমনটা হতে পারতো।
-- কিন্তু সমাজ কী বলবে?
ভাবি বললো।
-- ভাবি, জীবনটা আমার। তোমাদের নিয়েই আমার জীবন। যদি তোমরা মেনে নাও, আমি মানিয়ে নিতে পারি তাহলেই হবে। সমাজ তো অনেক কিছুই বলবে, কিন্তু আমার জীবন আমাকেই সাজাতে হবে।
-- তাও ঠিক বলেছো।
-- আব্বু আম্মু, তোমাদের কী মত?
-- আমি তোর সাথে একমত।
পাশ থেকে আব্বু বললো।
-- আম্মু তুমি?
-- আমিও একমত। কিন্তু..?
-- কিন্তু কী?
-- এই অবস্থায় অদ্রিতা রাজি হবে তো?
-- দেখো, তুমি একজন মা। ও একটা মেয়ে, তুমিই পারবে ওকে রাজি করাতে।
-- কিন্তু তুই তো বেকার? আমি কোন ভরসায় তোর সাথে ওর বিয়ে দিবো?
-- আম্মু, আমি আছি তো। ওর অনার্সের রেজাল্ট বের হলেই, আমার অফিসে চাকরি নিয়ে দিবো।
পাশ থেকে ভাইয়া বললো।
-- আচ্ছা, তাহলে আমি অদ্রিতার সাথে কথা বলি।
সেদিন রাত্রে আম্মু অদ্রিতার সাথে কথা বললেন। কোনো মেয়েই এই অবস্থায় বিয়েতে রাজি হবে না। কিন্তু আম্মুর কথা অদ্রিতা ফেলতে পারেনি। আগামীকাল আমার আর অদ্রিতার বিয়ে। আত্নীয় স্বজনদের বলা হয়েছে বিয়েতে আসতে। কিন্তু তাঁরা যখন শুনলো, অদ্রিতা ধর্ষিতা, তখন অনেকেই অনেক কথা বললো। অনেকে আসবেন ও না। আম্মুর সোজা কথা, আসলে আসুক, না আসলে সমস্যা নেই। পরদিন দুপুরে মার্কেটে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম আমি, আম্মু, অদ্রিতা আর ভাবি।
রাত্রে কাজি এনে পারিবারিক ভাবে অদ্রিতার সাথে আমার বিয়ে হলো। আমি জেনে শুনেই অদ্রিতাকে বিয়ে করেছি। আমার পরিবারও মেনে নিয়েছে। আমরা সবাই যদি এমন মনোভাব নিয়ে সমাজকে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে একটি ধর্ষিতা মেয়ের জীবনও আলোয় আলোকিত হবে। শুধু প্রয়োজন আমাদের পুরোনো চিন্তা-ধারার একটু পরিবর্তন।
(সমাপ্ত)
গল্প নিয়ে কিছু কথাঃ অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি ধর্ষিতা মেয়েকে কি বিয়ে করা সম্ভব? প্রতি উত্তরে বলবো, কেন নয়? এতে তো সেই মেয়েটির কোনো অপরাধ থাকে না। কোনো মেয়েই চাইবে না, তাকে কেউ ধর্ষণ করুক। আর যেই মেয়ে গুলোর সম্মতি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ধর্ষিতা শব্দটার প্রয়োগ বেমানান। এক মুহুর্তের জন্য আপনার বোনটাকে একটি ধর্ষিতা মেয়ের জায়গায় বসান। দেখবেন আপনি এবং আপনার পরিবারের পক্ষে একটি ধর্ষিতা মেয়েকে পরিবারের একজন করতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না।
( আমি এখনো ছোট মানুষ। যদি ভুল কিছু বলে থাকি, তাহলে ক্ষমা প্রার্থী)
 
Last edited by a moderator:

Khaled Al Mahmud

সুপার ব্লগার
#3
অসা
View attachment 75
বাসায় কেউ নেই, আমি একা। আনুমানিক রাত দশটার একটু উপরে, খাওয়া শেষ করে হাঁটতে বেড়িয়েছি। বাসায় কেউ থাকলে সেটা সম্ভব হতো না। শহরের এক পাশেই গ্রাম আর হলুদের সমারোহে সরিষা ক্ষেত। খেতের আল বরাবর হেঁটে যাচ্ছি। কুয়াশা পড়তেছে ধীরে ধীরে। একটু একটু করে হাওয়া বইছে খোলা ফসলের প্রান্তরে। হঠাৎ একটা গোঙানির আওয়াজ পেলাম। কিন্তু আশে পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ভাবলাম হয়তো মনের ভুল। কিন্তু একটু পর আবারও সেই আওয়াজ। তাই মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করে, চারদিকে খুঁজতে থাকলাম। কিছুটা সামনে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে পড়ে আছে। শরীরে রক্ত লেগে আছে, নড়তে পারতেছে না। জামার অনেক জায়গায় ছেঁড়া। আমার গায়ের সুয়েটার খোলে, সেটা মেয়েটার গায়ে জড়িয়ে দিলাম। তারপর মেয়েটাকে সেখান থেকে নিয়ে গেলাম সদর হাসপাতালে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে আমার বন্ধু রাফিন'কে ফোন করে ওর আব্বুর ব্যাপারে জেনে নিলাম। আংকেল এখানকার সদর হাসপাতালের ডাক্তার। উনি হাসপাতালেই আছেন। তাই আর ঝামেলা পোহাতে হবে না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আংকেল মেয়েটাকে নিয়ে গেলেন চিকিৎসা করতে। আধ ঘন্টা পর তিনি ফিরে এলেন, কিন্তু মুখটা ফ্যাকাসে।
-- আংকেল, মেয়েটির কী অবস্থা?
-- তার আগে এটা বলো, মেয়েটিকে তুমি চিনো?
-- না আংকেল। আমি হাঁটতে গিয়েছিলাম, গ্রামের ধারে। সেখানেই মেয়েটিকে এই অবস্থায় পাই।
-- ভালই করেছো। আর কিছুটা সময় দেড়ি হলে, মেয়েটির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারতো।
-- কেন আংকেল? কী হয়েছে মেয়েটির সাথে?
-- মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মেয়েটি বাঁচবে। তবে যে আঘাতটা পেয়েছে, সেটা কাটিয়ে উঠতে অনেকটা সময় লাগবে।
-- মেয়েটি কিছু বলেছে আপনাকে?
-- না, এখন সেই অবস্থায় নেই। এক কাজ করো, তুমি এখন বাসায় চলে যাও। আমি নার্সদের বলে দিচ্ছি মেয়েটার খেয়াল রাখতে। চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- আচ্ছা আংকেল।
তারপর হেঁটে হেঁটে চলে এলাম বাসায়।
ভাবতেই অবাক লাগে। আমি আমার বোনকে সব সময় আগলে রাখি, আর অন্যের বোনকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাই। তার সম্মান, সম্ভ্রমের কথা চিন্তা করি না। এটাই আমাদের মনুষ্যত্ব।
পরদিন সকালে হাসপাতালে গেলাম মেয়েটিকে দেখতে। ডাক্তার আংকেল বলেছেন এখন আগের থেকে ভালো আছে অনেকটাই। এভাবেই কেঁটে গেল আরও চার পাঁচটা দিন। মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছে। একদিন মেয়েটি জানতে চেয়েছিল, তাকে কে এনেছে হাসপাতালে? তারপর নার্স এসে আমাকে ভিতরে নিয়ে যায়। মেয়েটি আমাকে দেখে কিছু বলেনি। আমি মেয়েটির কাছে তাঁর নামটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ছোট্ট করে উত্তর দিয়েছিল অদ্রিতা। আর একটা শব্দও করলো না। হয়তো এখনো আমায় বিশ্বাস করতে পারছে না। কেননা আমার মতোই কোনো একজন, যে মানুষরুপী জানোয়ার, সে ওর সাথে এমনটা করেছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে যাই মেয়েটির খোঁজ-খবর নিতে। যেহেতু আমিই মেয়েটিকে হাসপাতালে এনেছি, ওর সব দায়িত্ব এখন আমার। যতদিন না তাকে তাঁর বাড়িতে পাঠাতে পারছি।
মেয়েটিকে হাসপাতালে এনেছি দশ দিনের মতো হয়ে গেছে।
একদিন বসে আছি হাসপাতালের বারান্দায়। ঠিক তখনি আম্মুর কল এলো।
-- বাবা, তুই কোথায়? তাড়াতাড়ি বাসায় আয়, আমরা এসে পড়েছি।
-- আসছি।
তারপর নার্সের সাথে কথা বলে, তাড়াতাড়িই চলে গেলাম বাসায়। কারণ, বাসা তালা দেওয়া। আব্বু, আম্মু, ভাইয়া , ভাবি, কারো কাছেই বাসার চাবি নেই। সবাই বাড়িতে গিয়েছিল, আজ ফিরেছে।
সন্ধ্যায় আবার যাচ্ছি হাসপাতালে। তখনি আম্মু সামনে এসে দাঁড়ালো।
-- এই সন্ধ্যায় কোথায় যাচ্ছিস?
-- হাসপাতালে।
-- হাসপাতালে কেন? কী হয়েছে?
-- চিন্তা করো না আম্মু। আমার কিছুই হয়নি। আমি একটু পরেই চলে আসবো, এসে সব বলবো।
-- আচ্ছা, সাবধানে যাস।
-- হুম।
তারপর হাসপাতালে গিয়ে মেয়েটির খোঁজ-খবর নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। রাত্রে খাওয়ার সময়, সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করতেছে কী হয়েছে? আমি কেন হাসপাতালে গিয়েছিলাম?
-- একটা মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলাম।
-- কে মেয়েটি? ওর সাথে তোর কিসের সম্পর্ক?
আম্মু জানতে চাইলো।
-- নাম অদ্রিতা, এর বেশি কিছু জানিনা। কয়েকদিন আগে, মেয়েটিকে গ্রামের পাশে সরিষার ক্ষেতে পেয়েছিলাম আহত অবস্থায়। তখন মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার বললো, মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
-- এখন কী অবস্থা মেয়েটির?
আব্বু জানতে চাইলো।
-- এখন অনেকটাই সুস্থ আছে।
-- ভালই করেছিস বাবা, মেয়েটিকে বাঁচিয়ে। কাল একবার আমায় নিয়ে যাবি হাসপাতালে? মেয়েটিকে দেখবো।
আম্মু বললো পাশ থেকে।
-- আমিও যাবো মা।
ভাবিও আগ্রহ দেখালো।
-- আচ্ছা, নিয়ে যাবো নে।
পরদিন সকালে আম্মু আর ভাবিকে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। উনারা ভিতরে গিয়ে অনেকক্ষণ কাঁটালেন অদ্রিতার সঙ্গে।
দু'দিন পর হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেওয়া হলো অদ্রিতাকে। আম্মুকে আর ভাবিকে সঙ্গে নিয়ে, অদ্রিতাকে বাসায় নিয়ে এলাম। আমি গেলে হয়তো আসতে চাইতো না, কিন্তু আম্মু আর ভাবি যাওয়াও ভয় পায়নি। বাসার অতিথিদের রুমে ওর থাকার ব্যবস্থা করা হলো। আম্মু আর ভাবি সারাক্ষণ ওর খেয়াল রাখছে, মাঝে মাঝে ডাক্তার আংকেল এসে দেখে যাচ্ছেন।
রাত্রে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।
-- অদ্রিতাকে ওর বাড়িতে পাঠাতে হবে তো নাকি?
পিছনে ফিরে দেখলাম আম্মু।
-- হুম। তুমি ওর সাথে কথা বলে, ওর বাড়ির লোকদের নাম্বার নিয়ে কথা বলো।
-- আচ্ছা।
আম্মু চলে গেলেন। আধ ঘন্টা পর আবার ফিরে এলেন।
-- ওর পরিবারের সাথে কথা বলেছো?
-- হুম।
-- কী বলেছেন উনারা?
-- অদ্রিতার বাবা মা ছোট বেলায় মারা যায়। ও চাচার কাছেই মানুষ হয়েছে। ওকে ওর বিয়ের দিন কিডন্যাপ করা হয়। এই অবস্থায়, ওর চাচা, ওকে আর ফিরিয়ে নিবে না।
-- তাহলে এখন কী করার?
-- ওর তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বাবা। আমাদেরই কিছু একটা ভাবতে হবে।
-- হুম, আম্মু। তোমরাও ভাবো, আমিও ভাবতে থাকি। দেখি কিছু পাই কিনা?
সেদিন আর ভালো করে ঘুম হয়নি। সারারাত চিন্তা করেছি। একটা মেয়েকে যখন বাঁচিয়েছি, তখন তো তাঁকে আর রাস্তায় ফেলে দিতে পারি না?
সকালে খেতে বসেছি। অদ্রিতাকে ওর থাকার রুমেই খাবার দেওয়া হয়।
-- কিছু ভেবেছিস বাবা?
আম্মু জানতে চাইলো।
-- হুম।
-- কী ভেবেছিস?
পাশ থেকে ভাইয়া বললো।
-- তোমাদের আপত্তি না থাকলে, আমি অদ্রিতাকে বিয়ে করতে চাই।
আমার কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল।
-- এটাই ভাবছো তো, একটা ধর্ষিতা মেয়েকে কেন বিয়ে করবো? দেখো, এতে তো ওর কোনো দোষ নেই। আজ আমার একটা বোন থাকলে, তার সাথেও এমনটা হতে পারতো।
-- কিন্তু সমাজ কী বলবে?
ভাবি বললো।
-- ভাবি, জীবনটা আমার। তোমাদের নিয়েই আমার জীবন। যদি তোমরা মেনে নাও, আমি মানিয়ে নিতে পারি তাহলেই হবে। সমাজ তো অনেক কিছুই বলবে, কিন্তু আমার জীবন আমাকেই সাজাতে হবে।
-- তাও ঠিক বলেছো।
-- আব্বু আম্মু, তোমাদের কী মত?
-- আমি তোর সাথে একমত।
পাশ থেকে আব্বু বললো।
-- আম্মু তুমি?
-- আমিও একমত। কিন্তু..?
-- কিন্তু কী?
-- এই অবস্থায় অদ্রিতা রাজি হবে তো?
-- দেখো, তুমি একজন মা। ও একটা মেয়ে, তুমিই পারবে ওকে রাজি করাতে।
-- কিন্তু তুই তো বেকার? আমি কোন ভরসায় তোর সাথে ওর বিয়ে দিবো?
-- আম্মু, আমি আছি তো। ওর অনার্সের রেজাল্ট বের হলেই, আমার অফিসে চাকরি নিয়ে দিবো।
পাশ থেকে ভাইয়া বললো।
-- আচ্ছা, তাহলে আমি অদ্রিতার সাথে কথা বলি।
সেদিন রাত্রে আম্মু অদ্রিতার সাথে কথা বললেন। কোনো মেয়েই এই অবস্থায় বিয়েতে রাজি হবে না। কিন্তু আম্মুর কথা অদ্রিতা ফেলতে পারেনি। আগামীকাল আমার আর অদ্রিতার বিয়ে। আত্নীয় স্বজনদের বলা হয়েছে বিয়েতে আসতে। কিন্তু তাঁরা যখন শুনলো, অদ্রিতা ধর্ষিতা, তখন অনেকেই অনেক কথা বললো। অনেকে আসবেন ও না। আম্মুর সোজা কথা, আসলে আসুক, না আসলে সমস্যা নেই। পরদিন দুপুরে মার্কেটে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম আমি, আম্মু, অদ্রিতা আর ভাবি।
রাত্রে কাজি এনে পারিবারিক ভাবে অদ্রিতার সাথে আমার বিয়ে হলো। আমি জেনে শুনেই অদ্রিতাকে বিয়ে করেছি। আমার পরিবারও মেনে নিয়েছে। আমরা সবাই যদি এমন মনোভাব নিয়ে সমাজকে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে একটি ধর্ষিতা মেয়ের জীবনও আলোয় আলোকিত হবে। শুধু প্রয়োজন আমাদের পুরোনো চিন্তা-ধারার একটু পরিবর্তন।
(সমাপ্ত)
গল্প নিয়ে কিছু কথাঃ অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি ধর্ষিতা মেয়েকে কি বিয়ে করা সম্ভব? প্রতি উত্তরে বলবো, কেন নয়? এতে তো সেই মেয়েটির কোনো অপরাধ থাকে না। কোনো মেয়েই চাইবে না, তাকে কেউ ধর্ষণ করুক। আর যেই মেয়ে গুলোর সম্মতি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ধর্ষিতা শব্দটার প্রয়োগ বেমানান। এক মুহুর্তের জন্য আপনার বোনটাকে একটি ধর্ষিতা মেয়ের জায়গায় বসান। দেখবেন আপনি এবং আপনার পরিবারের পক্ষে একটি ধর্ষিতা মেয়েকে পরিবারের একজন করতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না।
( আমি এখনো ছোট মানুষ। যদি ভুল কিছু বলে থাকি, তাহলে ক্ষমা প্রার্থী)
অসামান্য নিদারুন
 

বর্ণমালা এন্ড্রয়েড এপ

নতুন যুক্ত হয়েছেন

Top