তিন চাকায় বাঁধা জীবন ।। আবু সাঈদ দেওয়ান সৌরভ

#1
19-9-jpg.425

লঞ্চ থেকে নেমে সদর ঘাট থেকে রিক্সায় ওঠলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব। অর্পার সাথে চার বছরের সম্পর্ক কিন্তু আমাদের কখনো দেখা হয়নি , কথা হয়েছে শুধু মোবাইলে। আজ প্রতীক্ষার পালা শেষ হবে, সারাদিন রিক্সায় করে ঘুরবো, সুযোগ বুঝে আলতো করে ঠোটের উষ্ণ ভালবাসার ছোয়ায় সিক্ত হবো দুজনে , আমার ও তার হাতের স্পর্শে তৃপ্ত হবে আমাদের হৃদয়। চার বছরে দেখা না হলেও সারাজীবনের পরিকল্পনা করা হয়ে গেছে। এটা যারা প্রেম করে বা করেছে তারা ভাল বুঝবে।

হঠাৎ গাড়ির পো-পো শব্দে আমি স্বপ্নের রাজ্য থেকে ফিরে এলাম, দেখলাম ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়েছি। একটু খেয়াল করতেই দেখলাম মধ্যবয়সী রিক্সাওয়ালার সাদা চামড়া রোদ্রের তাপে লাল হয়ে গেছে, চেহারা গামছা দিয়ে বাধঁা। রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম মামা কতক্ষন লাগবো?। তার উওর জানি না মামা। লোকটার উওরে আন্তরিকতা উপলদ্ধি করলাম এবং বুঝতে পারলাম লোকটা ভাল। তাই তার সাথে গল্প করে জ্যামের সময়টা কাজে লাগানোর চেষ্টা করলাম। মামা কতদিন দিন ধরে রিক্সা চালান?, বাড়ি কোথায়? প্রশ্ন করতেই লোকটা হাঁসি মুখে আমার দিকে একটু তাকিয়ে সামনের দিকে চেয়ে কথা বলা শুরু করলো। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর, দশ বছর হলো রিক্সা চালাই। তার মুখে গামছা বেধেঁ রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। পরিবারের বা গ্রামের কেউ জানে না আমি রিক্সা চালাই, তাছাড়া ছেলে-মেয়েরা ঢাকায় থেকে পড়াশুনা করে, তাদের যেন কোন সমস্যা না হয় এ জন্যই! এই কথা বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রিক্সাওয়ালা। ছেলে-মেয়েরা কোথায় পড়াশুনা করে জিজ্ঞেস করলাম।

কোথায় পড়ালেখা করে কখনো জিজ্ঞেস করিনি, তারা ঢাকায় থাকলেও আমি কখনো তাদের সাথে দেখাও করিনি কারণ তারা যেন কখনো রিক্সাওয়ালার সন্তান বলে কোন জায়গায় লজ্জা না পায়, কয়েকবছর পর পর বাড়িতে গেলে দেখা হয়। তাকে জিজ্ঞেস করলাম মামা রিক্সা চালাতে গিয়ে আপনার খারাপ কোন ঘটনা ঘটেছে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে লোকটা বলল মাঝে-মাঝেই খারাপ ঘটনা ঘটে। খারাপ ঘটনা না লজ্জার কি বলবো জানি না কিন্তু আমার জীবনে সবচেয়ে কষ্টের একটি দিন আছে। সেই দিনের কথা মনে হলে রিক্সা চালাতে মন চায় না। চোখের কোণে পানি আর আবেগপ্লুত কন্ঠে ঘটনা বলতে শুরু করলো।

ছয় মাস আগের কথা একদিন দুপুরে রোকেয়া হলের সামনে থেকে একজন ছেলে ও বোরকা পরা মেয়ে রিক্সায় ওঠল শুধু বললো সারাদিন ঘুরবে, আমি কোন কথা বলিনি মাথা নেড়ে শুধূ প্রস্তাবে রাজি হওয়ার সম্মতি দিলাম। একটু নিরব রাস্তায় প্রবেশ করতেই আশ্চযর্য রকমের অঙ্গ ভঙ্গি আর অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়ে লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে গেলো। আমার কিছুই করার ছিল না, কারণ আমি সাধারণ রিক্সার ডাই্রভার। যতই সময় যেতে লাগল তাদের নিলর্জ্জ কর্মকান্ড বাড়তে থাকল, তাদের বেহায়া কর্মকান্ড আমার শরীর ও মনে কাটাঁর মত বিধঁতে থাকল। যখন প্রায় সন্ধা অল্প অল্প অন্ধকার তখন ছেলেটা একটা গাছের আড়ালে গাড়ি থামাতে বলে আমাকে একটু দুরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বললো। আমি একটু আড়ালে গিয়ে অপেক্ষা করলাম। কিছুক্ষন পরে ছেলেটা আমাকে ডেকে বলল মামা আমাদের রোকেয়া হলের সামনে নামিয়ে দেন। তাদের নামিয়ে দেওয়ার পর ছেলেটা ন্যায্য ভাড়ার চেয়ে টাকা বেশি দিয়েছিল, টাকা হাতে পাওয়ার পর খুশি হওয়ার কথা থাকলে চোখের পানি আটকাতে পারিনি। রিক্সা নিয়ে ফেরার পথে পিছন ফিরে তাকানোর সাহস আমার হয়নি।

দিনের শেষের চিত্রটা আমাকে আজও কাঁদায়। মেসে ফিরে দুইদিন ঘরের বাইরে বের হয়নি লজ্জায়, শুধু কেঁদেছিলাম। ভেবেছিলাম কখনো আর রিক্সা চালাবো না কিন্তু অভাবের কারনে তা পারিনি। তারপর থেকে কখনো কোন ছেলে ও মেয়েকে এক সাথে রিক্সায় ওঠাই না।
আমি প্রশ্ন করলাম কারণ কি মামা?
রিক্সাওয়ালা বললো, যখন ছেলেটা আমাকে টাকা দিচ্ছিলো তখন মেয়েটার মুখের নেকাব খোলা ছিল। আমার মনে হলো আমার ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করা উচিত কারণ নিলর্জ্জ মেয়েটা ছিল আমার মেয়ে। নিজের মেয়ের জীবনের একটা নোংরা দিনের সাক্ষী তারই বাবা আপনি ভাবতে পারেন? প্রশ্ন করলো আমাকে। রিক্সাওয়ালার প্রশ্ন শুনে আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি, উওর দেওয়ার ক্ষমতা ও মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
এতো কিছুর পরেও সেদিনের একটা বিষয়ে আমি খুশি, আমি ভাগ্যবান কারণ আমার মুখে গামছা বেধে রাখার কারনে আমার মেয়েটা আমাকে চিঁনতে পারেনি, ও হয়তবা কখনো চিন্তাও করতে পারবে না রিক্সাওয়ালাটা ওর বাবা ছিল। তাদের সাথে আমার কোন কথা বলতে হয়নি , কথা বললে হয়ত কন্ঠ শুনে চেঁনার সম্ভবনা ছিল। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন ওর সাথে দেখা না হয়। আমি কিভাবে মেয়েটার চোখের দিকে তাকাবো বলেন?। রিক্সাওয়ালার কথা যখন শেষ হলো আমাদের দুইজনের চোখে পানি।

সেদিন আমার আর অর্পার দেখা হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু আমরা রিক্সায় করে ঘুরতে যাইনি। আমাদের অতিবাহিত সময় ও ভালবাসার প্রকাশ গুলো নিদ্রিষ্ট দুরত্বের মধ্যেই শেষ হয়েছিল।
 
Last edited by a moderator:

বর্ণমালা এন্ড্রয়েড এপ

ফেসবুকে বর্ণমালা ব্লগ

নতুন যুক্ত হয়েছেন

Top