প্রেমের সাতকাহন ।। মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

#1
20160603102024-jpg.399

গল্পটা কীভাবে আর কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। প্রথম থেকে শুরু করতে গেলে অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা আসবে। বাড়বে গল্পের কলেবর বৃদ্ধি পাবে। ফলে নির্ঘাত পাঠকের বিরক্তির কারণও তৈরী হবে। তার চেয়ে সংক্ষেপে করা যাক সব। আমার মনে হয় এ ঘটনাটা শেষ থেকে শুরু করাই যুক্তিযুক্ত।

ভাল লাগে না। অনেক কিছুই ভাল লাগে না। আমার ভাল না লাগার তালিকা অনেক। এত ভাল না লাগা নিয়ে বেঁচে থাকা যায়? আজকাল বন্ধু বান্ধবরাও আমাকে দেখে বোধ হয় বিরক্তিবোধ করে। আমার কথাগুলোই হয়তো তাদের ভাল লাগে না। আমার ভাবতেই অসহ্য লাগে প্রেম নামের সম্পর্কটির কথা। খুউব খুব বিরক্ত হই এই বিষয়টাতে। সে দিন এক বন্ধু মুখের উপর সরাসরি বলে বসল- যা ব্যাটা, তোকে আসলে কেউ পাত্তা দেয় না। প্রেম করার কোয়ালিটি তোর নাই। পারিস না বলেই তো এসব ভাল লাগে না। হয়তো বন্ধুর কথাটাই সত্যি! প্রেম- কত সুন্দর একটা শব্দ। অথচ আমরা কিছু মানুষ এই শব্দটাকে পুরোপুরি নষ্টই করে ফেলেছি। যে কোনও ভাবে পরিচয়। তারপর ডেটিং! ডেটিং না করলে প্রেম নেই। গত কয়েক মাস হলো আমার এক বন্ধু রাত বারটা থেকে রাত দুইটা-আড়াইটা পর্যন্ত মোবাইলে কথা বলে। বাড়ি থেকে টাকা বেশি আনে নানা অজুহাতে মাসে মাসে। আর আমার জুতো পরে বাইরে যায়।

সে দিন একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, কী-রে, যে টাকা নষ্ট করিস এতদিনে তো কয়েক জোড়া জুতো কেনা যেত। এভাবে আর কতদিন? বন্ধুটির ভীষণ রাগ; অনেকগুলো কথা বলল। কয়েকদিন আগে এসে বলেছে দোস্ত তোর কথাই ঠিক। আজ গিয়েছিলাম সেই মেয়ের সাথে দেখা করতে। জীবনটাই মাটি। আসলে যারা সুন্দরী মেয়ে তাদের পিছনে অনেক ভাল ভাল ছেলেরা থাকে- ইত্যাদি ইত্যাদি। বিরক্ত লাগে না এসব কথা শুনতে? আর আমার একজন বন্ধু তাসনিফ আদনান। একজন প্রাণোচ্ছল তরুণ। চোখে-মুখে স্বপ্নের রঙিন দীপ্তি। হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা নবোদিত নেশা উন্মুখ। তা আলো ছড়াবে, আলোকিত করবে চারদিক। সে হাসবে, হাসবে মানুষ ও মানবতা, এই তার কামনা। তবে প্রতিভা উন্মেষের পূর্বে সে চায় বাস্তবতার পায়ে দাঁড়াতে। বাস্তবতা অনুভব করে পথ চলতে। কিন্তু কেন যেন আশার সাগরে তীর থেকেই তাকে বারবার ফিরে আসতে হচ্ছে। পেছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে পদে পদে। আমাদের বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে এর কারণ কিছুটা আঁচ করতে পারা যায়। অনেক প্রতিভাবান তরুণ আছে, যারা আর্থিক বিপর্যয়ের স্বীকার হয় জীবনের পরতে পরতে। চাইলেও নিজের অনেক অসাধারণ প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে না। তাই হয়ত আনমনে গালি দিতে থকে নিজেকে অথবা ¯্রষ্টাকে। কখনও নিজের পরিবেশ বা প্রতিবেশকে। তাসনিফ আদনানও তাদের একজন।

তার হাসির মাঝে স্বপ্ন থাকলেও স্বপ্নে নেই হাসি। স্বপ্ন মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায স্বপ্নহীন জীবন অর্থহীন জড়বস্তুরই নামান্তর। সে জন্য তাসনিফ স্বপ্ন দেখে; একদিন অনেক বড় হবে। তার স্বপ্নটিও বিস্তৃত হয়ে ছায়া বিলাবে। স্বপ্নের রংধনু রঙে রঙে হবে রঙিন। কিন্তু আচানক কোত্থেকে যেন কালো মেঘেরা এসে ভিড় করা শুরু করল তার চারপাশে। স্বপ্নের নীলাকাশ যেন ছুঁয়ে যেতে লাগল আঁধারে আঁধারে। মনের ভেতর ঘূর্নিপাক শুরু হলো অজানা আতঙ্কের। শুরুতে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরে নিজেকে সামলে নেয় ও।
কারণ, সে জানে এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে একদিন সাধনার প্রাপ্তি নত হয় ছোঁবে তার দু’কদম। তারুণ্যের জয়ধ্বনি শিহরণ জাগাবে তার শিরায় শিরায়। তার মনে পড়ে, কোথায় যেন পড়েছিল, “অসম্ভবকে সম্ভব করাই একজন তরুণের কাজ।” এই বাক্যটি তাকে প্রেরণা যোগায়, সামনে চলতে পথ দেখায়। এতে আছে একটি শক্তি, মহাশক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই তাসনিফ বেঁচে থকতে চয়। বাঁচাতে চায় মানুষকে। সে না থাকলেও বিচরণ করতে চায় মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে আজীবন। দীর্ঘদিন থেকে তার হৃদয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটি স্বপ্ন। কাঙ্খিত স্বপ্ন নিয়ে হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগিয়েও চলছিল সে। কিছু একটা করতে চায়। কিছু গড়তে চায় তাসনিফ। বাঁধতে চা স্বপ্নের নীড়। তার রুচিবোধ ও চিন্তাধারায প্রসন্নতা আছে। তার সম্পর্কে সঠিকভবে বলতে গেলে ঠিক এভাবে বলতে হবে সৃজনশীল চিন্তার একজন পরিপক্ক বিদ্যার্থী। কথাবার্তায় পান্ডিত্যের ভবা স্পষ্ট পরিলক্ষিত। কথাকাজেও মেলে গুণী মানুষের পরিচয়।

তাসনিফের জীবন থেকে একুশটি বসন্ত পার হতে চলেছে। কিন্তু কাঙ্খিত বাসন্তী ফুলেরা ছুঁতে পারেনি তার জীবনক‚ল। সময়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক হল্লা করেও সুবিধা করতে পারেনি সে। অসংখ্য ঝড়-ঝাঁপটার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। তারপরও নিজের অবস্থানে সবসময় অটল থাকার চেষ্টা করেছে। স্বপ্ন-সাধনায় পরিশ্রম করে চলেছে ক্লান্তিহীন। স্বপ্ন পূরণের স্বপ্নে তার চেহারায় প্রস্ফুটিত স্বচ্ছ ও নির্মল হাসির রেখা, যা তার নিরন্তর সাধনায় আলোর আভাস হয়ে দেখা দেয়। পথহারা অথৈ সাগরে বাতিঘরের ভ‚মিকা পালন করে। মানবহৃদয়ে সাহস সঞ্চার করে আত্মবিশ্বাস। তাই আত্মবিশ্বাসের সাথে লক্ষ্যপানে ছুটে চলাকেই জীবনের মানযিল হিসেবে ধরে নিয়েছে তাসনিফ আদনান। স্বপ্নের সাথে হেলেদুলে ভালোই কাটছিল তার দিনগুলো। ভালোগুলো আরও আলোকিত করতে একদিন সে নতুন একটি উদ্যোগ নিল। নতুন করে শুরু করতে চাইল পথ চলা। কারণ, ‘বিবাহ’ আল্লাহর একটি নিয়ামত। যে কোন কিছুতে তার প্রবৃদ্ধি, সার্থকতা ও সফলতা। তবে তাসনিফের এই ‘বিয়ে’ এর পূর্ণতার জন চাই কিছু আন্তরিক সমর্থক, কিছু সঙ্গী-সহযোগী এবং সাথী ও সারথী।

কিন্তু দুঃখ এবং দুঃখ। তার উদ্যোগটিতে যখন অন্তত একজনের দৃঢ়তার পরিচয় দরকার তখন কাউকেই পাওয়া যায়নি। উল্টো যাদের থেকে হৃদ্যতার আশা ছিল, তারাই কুড়াল মারে তার নড়বড়ে খুঁটিতে। আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছে তার হৃদয়। তাদের থেকে কিছুই পায়নি হিংসা-প্রতিহিংসা ও অবজ্ঞা ছাড়া। অবশেষে তার জীবনে আগমন ঘটে তানিয়ার সাথে তার বিয়ের পূর্ব-মূহুর্ত । তাই তাসনিফের বাবা-মা তানিয়ার বাড়িতে বিয়ে পাকা-পোক্ত করার জন্য যায়। আর তাসনিফের জীবনের কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ হবে। সেই দীর্ঘ লালিত আশা পাবে পূর্ণতা। কিন্তু ‘প্রভাতেই হলো সূর্যডুবি’! তা আর তার নসীবে হলো না। সহসা একটি ঘূর্ণিঝড় এসে হানা দিল স্বপ্ন কুটিরে। সবকিছু তছনছ করে দিল। দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিল স্বপ্ন-সাধের স্মৃতিস্তম্ভ। তাসনিফ আমাকে বলে সে, আমি সু-সংবাদ নেয়ার জন্য তানিয়ার কাছে ফোন করি। ওপাশ থেকে রিসিভার তুলে। সে বলল এক নাগারে আমি তোমার পিতা-মাতা কে না বলে দিয়েছি যে, তুমি একজন বেকার আমি তোমার পিতা মাতার তত্ত¡াবধানে থাকতে পারবো না। তুমি তোমার নিজের ক্যারিয়ার গঠন করো আমার থেকে অতি সুন্দরী মেয়ে তোমার জীবন সঙ্গীনী হিসেবে পাবে। বলে ফোন সুইচ অফ করে রেখেছে। ভাইয়া বলেন, তা হলে এতদিন আমি কার জন্য এত শ্রম ব্যায় করছিলাম? আরো অনেক রকম কথা। এই বিষয়গুলোই আমার খারাপ লাগে। আবার বন্ধুটির কথা সত্যি মনে হয়। হয়তো আমি সেকেলে মন মানসিকতার; একালে অচল। তার কান্নায় ভেঙ্গে পড়া দেখে আলতো ভাবে কাঁধে হাত রেখে বললাম। দেখো ভাই সময় তার নিজের গতিতে বয়ে যায়। সব কিছু শুরু হয় এবং শেষ হয়ে যায়। দিন যায় রাত আসে। রাত যায় দিন আসে। এভাবে শেষ হয় সপ্তাহ, পক্ষ, মাস ও বছর। এ সময় ও কালের প্রবাহ কখনও থামে না। আপন গতিতে চলে সম্মুখপানে অবিরাম। সদা সচল সময়ের স্রোতধারা বর্তমান বিলীন হয়ে যায় অতীতের বুকে। ভবিষ্যৎ ঠাই পায় বর্তমানের প্রাঙ্গনে। আগমন ঘটে নতুনের, প্রস্থান ঘটে পুরাতনের। জগতে এটা চরম সত্য; জাগতিক এই নিয়মেই আমাদের জীবন চলে।

দুঃখ কষ্টের ভার কেউ কারোটা বহন করতে পারে না। সেটা কাঁধে নিয়েই মানুষকে নির্দিষ্ট পথ আর সময় অতিক্রম করতে হয়। সাহসী আর বুদ্ধিমানেরা ধৈর্যের সাথে এই পথ আর সময়টুকু অতিক্রম করে। বোকারা চায় তার সেই ভার অন্য কারো কাঁধে কিছুটা তুলে দিতে। তোরা সেটাকে বলিস শেয়ার করা। তুই তো সেটাও করিস না। শোন মানুষের ভেতরের কষ্টটা অপার্থিব শক্তি সম্পন্ন কোন মানুষ যদি তোর সেই কষ্টের সময়টুকু তোর বন্ধু বা চলার সাথি হয় তা হলে দেখবি তোর কষ্টের সময় আর পথ খুবই দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। এর বাইরে দুর্বল অন্তরের বন্ধুরা তোর মনের আগুনে বাড়তি কিছু খড়কুটো তুলে দেওয়াছাড়া কিছুই করতে পারে না। তাছাড়া আদতে কষ্টের কোন শেয়ার নেই। বুঝলি বন্ধু। এর মধ্যে মসজিদের মাইকে তিন তিনটি টোকার আওয়াজ শোনাগেল। এটা আজানের পূর্বাভাস। এক্ষুনি আছরের আজান হবে। সে কান্না থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসির ব্যার্থ চেস্টা করল সে। প্রায় নির্জন উত্তরাকে সরব করে হেঁকে উঠল মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠে আ্ল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার।

আজান শেষে টেবিলের উপর রাখা মেসওয়াকটি হাতে দাঁড়াতে তাকে সম্বোধন করে বলি’লে আগে আছরের সালাত আদায় করে আসি। স্বশব্দে চেয়ারটা পেছনে সরিয়ে তাসনিফ আদনান উঠে দাঁড়ালো। তাসনিফ দুকদম সামনে বাড়িয়ে বলল,“নেশা অবস্থায় কি সালাত আদায় করা যায়”? এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে ওকে বললাম,নেশাইতো আমাকে মসজিদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে”রে। তাসনিফ আপনি মসজিদে সালাত আদায় করে আসেন,আমি ঐ বটগাছের সংলগ্ন টংদোকানের ভাঙা বেদীতে বসি। আমি সালাত আদায় করে এসে দেখি সে অলস ভঙ্গীতে বসে আকাশপানে অপলক নেত্রে তাকিয়ে। আনমনে বিড়বিড় করে কি যেন আওড়াচ্ছিল। আমি তার কাছে গিয়ে স্বশব্দে কাশি দিলাম। সে সম্বিত ফিরে ভাইয়া আসছেন,বসুন দেরীতে বেদীতে ফুঁ দিয়ে স্থানটি পরিষ্কার করে বসলাম। বসে তাকে বললাম তুমি দেখেছো এই বৃক্ষগুলো বহু বছর বাঁচে। কোন কোনটি দুই তিন শতাব্দী। মানুষের প্রাচীন ছাতা । একই বৃক্ষের ছায়ার নীচে বেড়ে ওঠে তিন চার প্রজন্মের মানুষ।যে শিশু এই বটবৃক্ষের ছায়ার নিচে খেলতে খেলতে বড়হ য়,সেই একদিন আরেক শিশুর জন্ম দিয়ে ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়। তারপর একদিন মরে যায়। বৃক্ষদের ভেতরে বটবৃক্ষ সবচেয়ে দুঃখী বৃক্ষ। এই বৃক্ষের জীবন মানুষের মত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর ডালপালার ভেতর থেকে নেমে আসে ঝুরি ধীরে ধীরে পরিনত হতে থাকে আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। এর প্রথম মূলটি। দীর্ঘ জীবন মানেই শোকের দীর্ঘ সফর। তাসনিফের ও দেহ মনন এবং অবয়বের হালকা হাসির ঝিলিক দিয়ে ওঠে।বৃষ্টির আগে পিঁপড়াগুলো যেমন টেরপায় তেমনিভাবে ঝড় বা ভ‚মিকম্পের আগ পাখিরা টের পায়।ওপর ধোঁয়া ওঠলে বোধগম্য হয় যে নিচে হয়তো আগুন জ্বলছে। আর এনড্রয়েড ফোন (ওয়াফাই) এর আওতায় আসলে যেমন সংযোগ পায় তেমনি আমিও সংযোগ পেলাম যে তাসনিফের মন হালকা হয়ে আসতেছে। এবার তাসনিফ স্বশব্দে হাসলো ভাই আপনিও পারেন বটে। আমি তাকে মজা করে বললাম“মিঞা আমি কী তোরে মিরাকলের শো-দেখলাম না শুনালাম যে হেসেদিলি।

একটু গাম্ভির্যপূর্ণ ভাব নিয়ে তাসনিফ কে বললাম,শোন বেটা ভালবাসা এক ধরনের অভ্যাস দেখনা সামান্য চা,পান সিগারেট ছাড়তেও মানুষের কত কষ্ট হয়। তাই বিচ্ছেদের কথা মাথায় রেখেই ভালবাসতে হবে। এই জন্যই আমাদের ধর্মে বারবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে বলা হয়েছে। পবিত্র আল কোরআনে এরশাদ হয়েছে“ প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে” সুরা আলি ইমরান:১৮৪ নং আয়াত। এবার তাসনিফ নড়ে চড়ে বসে । তারপর সে বলে“ এতনির্লিপ্ত আর আসক্তিহীন ভালোবাসা সম্ভব? মানে বলতে চাচ্ছি কাউকে বা কোন কিছুকে ভালোবাসার আর ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিতে থাকব তার বিচ্ছেদের! এমন করে ভালবাসা সম্ভব। আমি এবার স্বশব্দে হেসে বললাম। তেমন ভাবে ভালোবাসতে পারনি বলেইতো আজ কষ্ট পাচ্ছ। তোমার ভালবাসার মানুষকে হারানোর কথা তোমার কখনো মনেই আসেনি তাইনা? বিষাদমাখা মুখে তাসনিফ মাথা ঝাঁকায়। “তুমি ভেবেছিলে এমন সুখে এই একই গতিতে জীবনটা চলতে থাকবে। তাসনিফ!হ্যাঁ,ভালবেসে তোমরা বলো তোমাকে ছেড়ে কোনদিন যাব না। বোকার মতো এইসব কথা তারাই বলে যারা সেই সব শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়নি। তোমার জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত । এই সংক্ষিপ্ত জীবনে যত বেশি বস্তু তোমার হৃদয়ে জায়গা করে নেবে তত বেশি তুমি বিচ্ছেদ বেদনা ভোগ করবে। তাসনিফ প্রশ্ন করে,তাই বলে কি কাউকে বা কোন কিছুকে ভালবাসব না?

শিশুরমত চাপা হাসি দিয়ে তাকে আমি বললাম-অবশ্যই ভালবাসবে। ভালবাসাটা হবে বাইন মাছেরমত । মাইন মাছ চেন? হ্যা চিনি,সাপেরমত দেখতে। সেই বাইম মাছ কাদার ভেতরে থাকে কিন্তু তার গায়ে কাদা লাগেনা। তার গায়ে একটা পিচ্ছিল বর্ম লাগানো তাকে । মানুষেরজ্ঞান হলো সেই বর্ম। তাসনিফ জিজ্ঞেস করে,কিসের জ্ঞান?পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ জানতেও পারেনা। কেন সে পৃথিবীতে এসেছিল এই না জানার কারনে সে জঙ্গলের বাসিন্দা হয়ে জীবন কাটায়। অন্যান্য প্রাণীরা যেভাবে বাঁচে সেও তেমনিভাবে বাঁচে। সে বাঁচার জন্য প্রতিযোগিতা করে জঙ্গলে যেমন একজনকে বেচে থাকতে হরে অন্যজনকে মেরে ফেলতে হয়। তাসনিফ যোগকরে বলে‘এটাকে বলে সারভাইভাল অফদা ফিটেস্ট ডারউইন তার ইভোলিউশন থিয়োরিতে এমনটা বলেছিলেন। আরে তাসনিফ কথাটা ডারউইন বলেননি। ডারউইনের দি বায়োলজিস্ট হারবার্ট স্পেনসার প্রথম বলেছিলেন বাক্যটা “সারভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। এত অবাক হইয়োনা মানুষের উতপত্তি বানর থেকে এই মতবাদের বিরুদ্ধে সেমিনার করার জন্য অনেক তথ্যলব্ধ বই পড়তে হয়েছিল এটা সেই সব বই পড়ার ফল। যাই হোক বলছিলাম পারস্পাস অব লাইফ এর বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞান না থাকার ফলে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ পৃথিবীর আলো বাতাস ভোগ করে শেষে মরে যায়। অথচ তার জন্ম হয়েছিল মানুষ হিসেবে মৃত্যুটাও ডওয়ার কথা ছিল মানুষের মত। এই যে সে জঙ্গলের পশুর মতো বাঁচল এর কারন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই ছিল ভোগ। ভোগ মানে সুখ। এসবকে ভালোবেসে হৃদয়টা ভর্তি করে রেখেছিল। এসব এমন আসক্তি যা বিচ্ছেদকে ভ‚লিয়ে দেয়। অথচ বিচ্ছেদ ই মানুষের চরম পরিনতি।

তাসনিফ বলে,তাহলে হৃদয়টা তৈরী করা হয়েছে কী জন্য? ভালবাসার জন্যইতো নাকি? তার আগে তোমাকে একটা প্রশ্ন করি,বলো তো এই মহাবিশ্ব অসীম না সসীম? বিগব্যাংথিয়োরির মত অথবা কোন সৃষ্টিকর্তার দ্বারা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। তাই যা কিছু সৃষ্ট তাই সসীম। ‘বাহ। তাসনিফ সুন্দর করে উপস্থাপন করেছা,এখন বলো এই সসীম মহাবিশ্বের ভিতরে একটা অসীম বস্তু আছে বলোতো সেটা কী? কথাটা তাসনিফ শুনে আনমনা হয়েপড়ে,সে শিশুরমত মাথা ঝুকায় যার অর্থ আমার মনে পড়ছে না। সেই অসীম বস্তুর নাম হৃদয়। এই জন্যই বলা হয় অন্তরের চাহিদা অসীম। এই অসীম অন্তর বা হৃদয় সৃষ্টি করা হয়েছে এক অসীম সত্বার জন্য সেই অসীম সত্তার নাম আল্লাহ। তো হলে কি মানুষ শুধু আল্লাহকেই ভালবাসবে কোন মানুষ প্রাণী বা বস্তুকে ভালবাসার অনভ‚তি কেন সৃষ্টি করা হয়েছে। তাসনিফ ভালবাসা মানে হচ্ছে রেসপনসিবিলিটি বা দায়িত্বশীলতা যখন তুমি কউকে ভালবাস তখন তার দায়িত্ব নাও। এই দায়িত্বটা তোমাকে কে দেন?

তিনি দেন যিনি তোমার হৃদয়জুড়ে বসে আছেন। তিনি সমস্ত বিশ্বজগতের মালিক। সৃষ্টিকর্ত তিনি বলেছেন। জীবে দয়া কর আর তার সমস্ত সৃষ্টিকে ভালবাস। সেটা শুধু কথার কথা ভালবাসা নয়। সেই ভালবাসা এক বিশাল দায়িত্ব। তাই তার জন্য যখন ভালবাসবে তখন এই সৃষ্টি জগতের কেউ তোমার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তখন তোমার ভালবাসাই হবে পৃথিবীর আলো-বাতাস আর পানিরমত,যা সমস্ত পোকামাকড় জীবজন্তু থেকে শুরু করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান ভোগ করে। দেখ তুমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ! এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করা হয়েছে তোমার জন্য আর তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য। তুমি যখন তার হবে এই বিশ্বজগত সবকিছু তোমার হবে। তুমি যখন তার হবে না। তখন এই বিশ্বজগত সবকিছু তোমাকে বিচ্ছেদ বেদনা দেবে। তার সাথে এই সম্পর্কটাই প্রকৃত প্রেম। আর এই প্রেমটাকে বলে ইবাদত। এই প্রেমের জন্যই তোমাকে অসীম এবং অমূল্য এক বস্তু দেয়া হয়েছে। যেটার নাম হচ্ছে হৃদয়। সেই হৃদয়ের ব্যবহার আর প্রকৃত প্রেমের নিয়ম কানুন শেখনি বলে আজ এত কষ্ট পাচ্ছ।
 

বর্ণমালা এন্ড্রয়েড এপ

নতুন যুক্ত হয়েছেন

Top