বকুল ফুলের মালা ।। মিসবা তুহিন

মিসবা তুহিন

নতুন ব্লগার
#1
images-18-jpeg.270

ভোর ৬ টা - হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সাধারণত এতো ভোরে কারণ ছারা কখনো উঠিনা। কিন্তু আজকে আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বাইরে হালকা কুয়াশা পরেছে। কিছুক্ষণ পর পর পাখিদের কোলাহলে শিহরিত হচ্ছি। বেশ ভালো'ই লাগছিলো ঘুমটা ভেঙ্গে। হঠাৎ মনে হলো এতো তারাতারি যখন ঘুম থেকে উঠেই গেছি একটু বই পড়লে কেমন হয়। বিষয় টা মাথায় আসতে'ই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। রুমের এক কোণে বইয়ে'র স্তুপে অসংখ্য বই মাকড়শার জালে হাবুডুবু খাচ্ছে। আস্তে আস্তে মাকড়শার জাল গুলো পরিষ্কার করলাম। এক এক করে বই গুলো একপাশ থেকে আরেক পাশে নিচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম কোন বইটা পড়বো। এমন সময় বই গুলো'র মাঝে একটা পুরনো ডায়েরী'র অস্তিত্ব খুজে পেলাম। ডায়েরী'টা হাতে নিতেই শরীরে কেমন যেন একটা শিহরণ বয়ে গেলো। বিছানায় এসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে ডায়েরী'টা খুললাম। প্রথম পাতাতে'ই শুকনো ফুলে'র একটা মালা দেখলাম। চটকরে মাথাটা ঘুরে গেলো। মনে পরে গেলো পুরনো অতীত। যা বাস্তবতা'র দাপটে মস্তিষ্ক থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিলো। মনে পড়ে গেলো আমার শৈশব। আমার রচনা হ্যা আমার রচনা'র দেয়া শেষ উপহার ছিলো এই বকুল ফুলের মালা। রচনা ছিলো আমার শৈশব, আমার যৌবনে'র লালিত স্বপ্ন, আমার অতীত হাসি-কান্না'র একমাত্র সঙ্গী। তাকে হারিয়েছি তাও আজ বছর দশে'ক হবে। মাথায় এখন রচনা'ময় হাজারো স্মৃতি ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার বাড়ি থেকে খুব বেশী দূরে ছিলো না রচনা'দের বাড়ি। আমার খেলার সাথী, পড়ার সাথী, রাগ ও অভিমান সবই ছিলো রচনা। পুকুড় পাড়ে দৌড়া-দৌড়ী, কানামাছি ও লুডু খেলা সবই করেছি রচনা'র সাথে। যখন একটু একটু করে বড় হতে থাকলাম দুজনে তখন'ই বুঝে ছিলাম আমরা দুজন একে অপরে'র পরিপূরক। না আমি তাকে ছারা থাকতে পারতাম- না সে আমাকে ছারা থাকতে পারতো। আমরা দুজন - দুজনকে ভালোবাসি এ'কথা আলাদা ভাবে কখনো'ই একে অপরকে বলে বোঝানো'র প্রয়োজন মনি করি'নি। কারণ আমরা জানতাম আমরা একে অপরকে কতো বেশী ভালোবাসি। রচনা আমাকে কখনো'ই স্কুলে কোন মেয়ে বন্ধু রাখতে দিতো না। কারণ ও আমাকে কারণে-অকারণে ওহেতুক প্রচন্ড রকমে'র সন্দেহ করতো। এই যেমন রাস্তা দিয়ে চলার সময় যদি অচেনা কোন মেয়েও আমাকে পাশ কাটিও যেতো আর সে যদি তা দেখতো বা কোন মাধ্যমে শুনতো তাহলে বোর্ড বসিয়ে আমার বিচার করতো। ভাবতাম এটা হয়তো তার অতিরিক্ত ভালোবাসা'র বহিঃপ্রকাশ। আর আমিও ঐ জিনিস গুলো এরিয়ে চলতেই বেশী পছন্দ করতাম। কারণ আমিও রচনাকে প্রচন্ড রকমে'র ভালোবাসতাম তাই খুব বেশী হতাশ হতে দিতে চায়নি ওকে। গ্রামে থাকতাম তাই আমরা দুজনি খুব বেশী সচেতন থাকতাম। আমরা চায়তাম পরিপূর্ণ বয়স এবং দুজনে'র কেউ ভালোকিছু করা'র আগ পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক লোকজন জেনে যাক বা আমাদের পরিবার জানুক। তারপরও বিধিবাম। শতো সতর্কতা'র সত্ত্বেও বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতে'র আঘাতে লন্ড-ভন্ড হয়ে আমাদের সম্পর্কে'র কথা আমাদের দুজনের পরিবারি সহ আশে-পাশে'র অনেক মানুষ জেনে যায়। আমার উপর নেমে আসে অসহ্য পারিবারিক এবং মানুষিক যন্ত্রনা। একদিকে পারিবারিক চাপ অপরদিকে রচনাকে হারানো'র অজস্র ভয় আমাকে তাল ছেরে বেতাল বানিয়ে দিয়েছিলো। দিনের পর দিন রচনা'র সাথে যোগাযোগ হতো না আমাদের দুজনের পরিবার আমাদের সম্পর্কে'র বিষয়টা জানা'র পর। বলে বোঝাতে পারবো না কি পরিমান যন্ত্রণা আমাকে সব কিছু থেকে ছিটকে ফেলে দিয়ে ছিলো। টুক টাক যতোটুকু যোগাযোগ হয়েছে ততোবারি আমি রচনা'র কাছে আমার ভালোবাসা ভিক্ষে চেয়েছি কিন্তু ততোবারি সে আমাকে নিরাশ করেছে এবং প্রচন্ড রকমে'র অপমান করেছে। এতো মিষ্টি ভালোবাসা কি করে তার কাছে এতো তীতা হয়ে উঠেছিলো আমি সত্যি'ই বুঝতে পারি'নি। হয়তো তৃতীয় কোন পক্ষ আমার সম্পর্কে তার মস্তিষ্ক কিন্ঞ্চিত নয়তো পুরোপুরি বিকৃত করে দিয়েছিলো। প্রচন্ড চাপে আমার পড়াশোনা আমি নিজেই স্থগিত করে দিই। অন্যদিকে লোক মারফত যানতে পারি রচানা'রা পরিবারে'র সবাই এলাকা ছেরে চলে গিয়েছে আমার অযান্তে'ই। আমি পুরোপুরি মানুষিক ভাবে ভেঙ্গে পরি। নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলি। সামাজিক জাতনা, লোকেদে'র উপহাস ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে এক সময়ে নিজে চার দেয়ালে বন্দী করে ফেলি। রচনা আর আমার দুজনা'রি বকুল ফুল খুব পছন্দে'র ছিলো। সে চলে যাওয়া'র অনেকদিন পর তার খুব কাছে'র একটা বান্ধবী'র মাধ্যমে আমার জন্য এই বকুল ফুলের মালা খানা গেঁথে পাঠিয়েছিলো। এতোদিন পর তার হঠাৎ এই বকুল ফুলের মালা খানা পাঠানো'র বিষয়টিও আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি'নি। রচনা চলে যাওয়া'র পর তার স্মৃতি এবং এই বকুল ফুলে'র শুকনো মালা খানা ব্যতীত একসময় যে সে আমাকে ভালোবাসতো তার প্রমাণ করার মতো আর কিছুই আমার কাছে নেই। বহুদিন পর জানতে পারি সে তার নতুন সঙ্গী পেয়েছে এবং ভালো আছে। তাই আমি তাকে তার বর্তমান সত্য এবং শক্ত বন্ধন ছিন্ন করে অতীতে'র মিছে বন্ধনে আবদ্ধ করতে মোটেও চেষ্টা করি'নি আর। হ্যা মিছে বন্ধন। কারণ তার অদ্ভুত আচরণ আমার আর তার একসময়কার সত্য ভালোবাসা'র বন্ধন'কে মিথ্যে ভালোবাসা'র বন্ধন ভাবতে'ই বাধ্য করেছে আমাকে। এখন আমি সুস্থ এবং সুন্দর জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পরেছি। এখন হাজারো কষ্ট আমাকে লুকিয়ে কাঁদতে বাধ্য করে না-চোখের কোন বেয়ে রচনা'র ফেলে যাওয়া স্মৃতি এখন আর গড়িয়ে পরে না। অতীতে'র শতো বাধা উপেক্ষা করে বাস্তব জীবনে'র ভাজে ভাজে একটু-আকটু যন্ত্রণা আমার বেচে থেকে চলার পথকে বন্ধ করতে পারে না আর। জীবন টা এমন'ই হয়তো। শতোরুপী সুচনা তার ভালোবাসা সাথে নিয়ে সুখে থাকুক সারাটা জীবন। আর আমার অতীতে'র হারানো যন্ত্রণাকে সাথে নিয়ে রচনা'র দেয়া বকুল ফুলের মালা ডায়েরী'র প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত মলাট বদ্ধ অবস্থায় বেচে থাকুক হাজারো বছর...।
 
Last edited by a moderator:

Noman Sadi

নতুন ব্লগার
#4
সুন্দর লেখনী! এগিয়ে যাক এ কলম কথা!
 

বর্ণমালা এন্ড্রয়েড এপ

ফেসবুকে বর্ণমালা ব্লগ

নতুন যুক্ত হয়েছেন

Top